আমদানি-নির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে নতুন সম্ভাবনা, তবে রয়েছে ব্যয় ও বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর প্রকল্প দেশের জ্বালানি খাতে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের দ্বার উন্মোচন করতে যাচ্ছে। পাবনার রূপপুরে নির্মাণাধীন এই প্রকল্পের দুটি ইউনিট পুরোপুরি চালু হলে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণ করতে সক্ষম হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পদ্মা নদীর তীরে নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামোগত জ্বালানি প্রকল্পগুলোর একটি। রাশিয়ার কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতায় বাস্তবায়িত এই কেন্দ্রের দুটি রিয়্যাক্টর পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন মাত্রা যোগ হবে।
বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা পারমাণবিক শক্তির প্রতি আগ্রহ বাড়িয়েছে। বাংলাদেশও সেই বৈশ্বিক প্রবণতার অংশ হিসেবে পারমাণবিক শক্তির দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ এখনও আমদানিকৃত তেল, গ্যাস ও কয়লার ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য ওঠানামা কিংবা ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিদ্যুৎ খাতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সরবরাহ আরও স্থিতিশীল হবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক জ্বালানি আমদানির ওপর চাপও কমবে। শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের সুবিধা পাওয়া যাবে।
তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথ একেবারে সহজ ছিল না। কোভিড-১৯ মহামারি, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়সূচি থেকে পিছিয়ে যায়।
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম ইউনিট ২০২৩ সালের মধ্যে চালুর কথা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশা করছে, প্রথম ইউনিট ২০২৭ সালে এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৮ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে।
এদিকে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে প্রকল্পের সামগ্রিক ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘসূত্রতার কারণে আর্থিক চাপ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
রূপপুরের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে ক্ষুদ্র মডুলার রিয়্যাক্টর (এসএমআর) প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে সরকার। তুলনামূলকভাবে কম ক্ষমতার এসব রিয়্যাক্টর দ্রুত স্থাপনযোগ্য এবং ব্যয়ও অপেক্ষাকৃত কম হতে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোট আকারের পারমাণবিক প্ল্যান্ট আঞ্চলিক বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে কার্যকর বিকল্প হতে পারে। তবে প্রযুক্তিটির বাণিজ্যিক ব্যবহার এখনো বিশ্বব্যাপী সীমিত পর্যায়ে রয়েছে।
পারমাণবিক শক্তি পরিবেশবান্ধব ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের উৎস হলেও এর সঙ্গে নিরাপত্তা, দক্ষ জনবল, তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্বাধীন নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, পারমাণবিক প্রকল্পের সফলতা শুধু অবকাঠামো নির্মাণের ওপর নির্ভর করে না; বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও জনআস্থার ওপরও সমানভাবে নির্ভরশীল।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশও পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। ভারত আগামী কয়েক দশকে পারমাণবিক বিদ্যুৎ সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। পাকিস্তানও চীনের সহযোগিতায় একাধিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রূপপুর প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক জ্বালানি সক্ষমতার ক্ষেত্রে নতুন অবস্থান তৈরি করতে পারবে এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধু একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যদিও প্রকল্পটি ব্যয় বৃদ্ধি ও সময় বিলম্বের মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে, তবুও সফল বাস্তবায়ন দেশের বিদ্যুৎ খাতে একটি নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ এবং আধুনিক বিদ্যুৎ অবকাঠামো গঠনের পথও আরও সুগম হবে।
