সৌদি আরবের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা বিষয়ক একটি বিস্তৃত চুক্তি স্বাক্ষর করেছে যুক্তরাষ্ট্র। চুক্তির আওতায় সৌদি আরব ভবিষ্যতে নিজস্ব পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সমৃদ্ধ করার সুযোগ পেতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের কিছু শর্ত শিথিল করায় ইসরায়েলসহ যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের একাংশ আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে সৌদি আরব পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের পথ খুলে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব বুধবার একটি বহুল আলোচিত বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরের ঘোষণা দিয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এই সমঝোতার মাধ্যমে সৌদি আরব নিজস্ব পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সমৃদ্ধ করার সুযোগ পেতে পারে। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক শিল্পে কয়েক শ কোটি ডলারের নতুন ব্যবসায়িক সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ সুবিধা প্রথমদিকে পেতে পারে মার্কিন প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টিংহাউস, যারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত পারমাণবিক চুল্লির নকশা তৈরি করে।
মার্কিন প্রশাসনের দুটি সূত্র জানিয়েছে, আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের প র অল্প সময়ের মধ্যেই চুক্তির বিস্তারিত কংগ্রেসে উপস্থাপন করা হবে। রিপাবলিকানদের বড় অংশ এর প্রতি ইতিবাচক থাকলেও ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান—উভয় দলের কিছু আইনপ্রণেতা এবং ইসরায়েলের কর্মকর্তারা এতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তাদের মতে, বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির আড়ালে ভবিষ্যতে সৌদি আরব পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে কয়েক বছর ধরে ই আলোচনা চলছিল। সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের সময় এটি বৃহত্তর একটি কূটনৈতিক উদ্যোগের অংশ ছিল, যেখানে সৌদি আরবের ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার শর্ত অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজা যুদ্ধ শুরু হলে সেই কূটনৈতিক প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়ে। পরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই শর্তটি বাদ দিয়ে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার আলোচনা এগিয়ে নেন।
চুক্তির অন্যতম বিতর্কিত বিষয় হলো আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের ক্ষমতা সীমিত করার সম্ভাবনা। সমালোচকদের মতে, এতে ভবিষ্যতে কোনো পারমাণবিক স্থাপনা থেকে অস্ত্র তৈরির কাজে জ্বালানি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
এ ছাড়া সৌদি আরবের সঙ্গে যৌথভাবে পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদনের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের বিষয়েও দুই দেশ একমত হয়েছে। সমীক্ষা শেষে সৌদি আরবকে নিজস্ব ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা প্লুটোনিয়াম পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করার অনুমতি দেওয়া হতে পারে।
চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার আগে এটি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। অ্যাটমিক এনার্জি অ্যাক্ট অনুযায়ী কংগ্রেস চাইলে এর বিরুদ্ধে আপত্তির প্রস্তাব আনতে পারে। তবে প্রেসিডেন্টের ভেটো অতিক্রম করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন হওয়ায় বিশ্লেষকদের ধারণা, শেষ পর্যন্ত চুক্তিটি অনুমোদন পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
তবে কংগ্রেসে এটি নিয়ে তীব্র বিতর্ক হতে পারে। বিশেষ করে চুক্তির সঙ্গে যুক্ত দুটি গোপন সম্পূরক নথি প্রকাশের দাবি তুলেছেন কয়েকজন আইনপ্রণেতা। তাঁদের বক্তব্য, এসব নথি প্রকাশ না হলে তারা চুক্তির পক্ষে ভোট দেবেন না।
নতুন সমঝোতাটি যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘ওয়ান-টু-থ্রি অ্যাগ্রিমেন্ট’ কাঠামোর আওতায় সম্পাদিত হয়েছে। এই ধরনের আইনগত চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার নিয়ম নির্ধারণ করা হয় এবং পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধের বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়।
বর্তমানে ৫১টি দেশ ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের ২৬টি চুক্তি রয়েছে।
২০০৯ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে করা একই ধরনের চুক্তিতে কঠোর শর্ত আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় আমিরাত আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার অতিরিক্ত পরিদর্শন প্রটোকল গ্রহণ করে এবং নিজস্ব পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদনের অধিকারও ত্যাগ করে। ফলে সেই চুক্তিকে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন তুলনামূলকভাবে কিছু শর্ত শিথিল করেছে।
ইরানকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে নতুন এই চুক্তিকে ওয়াশিংটন ও রিয়াদের কৌশলগত সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট সৌদি আরব সফরে গিয়ে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেন। পরবর্তী কয়েক মাস ধরে দুই দেশের কর্মকর্তারা চুক্তির বিভিন্ন দিক চূড়ান্ত করেন।
অন্যদিকে সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা চুক্তিরও দাবি জানিয়ে আসছে। সৌদি কর্মকর্তাদের মতে, এমন চুক্তি ভবিষ্যতে ইরানের সম্ভাব্য আগ্রাসন মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি এবং ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে সৌদি আরবের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। সে কারণেই ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পরও রিয়াদ তেহরানের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে।
