বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে সামরিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু; বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বাড়ছে উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান উত্তেজনা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের জবাবে ইরান বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে। একই সঙ্গে ওমানের কিছু রাডার ব্যবস্থা এবং জর্ডানের একটি বিমানঘাঁটির জ্বালানি ও গোলাবারুদ সংরক্ষণাগারেও আঘাত হানার কথা জানিয়েছে তেহরান। এর ফলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নতুন করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়েছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলার প্রতিক্রিয়া হিসেবে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অন্যদিকে জর্ডান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। কুয়েতের সামরিক বাহিনীও আকাশপথে আসা শত্রুভাবাপন্ন লক্ষ্যবস্তু মোকাবিলার কথা জানিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নতুন করে সৃষ্ট বিরোধের মধ্য দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে তারা ব্যবস্থা নিচ্ছে। ওয়াশিংটনের মতে, হরমুজ প্রণালি কোনো একক রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন নয় এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এটি বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত।
তবে ইরান এ অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, প্রণালিটির নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণে তাদের সার্বভৌম অধিকার রয়েছে। দেশটির সামরিক নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপকে অবৈধ বলে আখ্যা দিয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, সাম্প্রতিক অভিযানে ইরানের বিভিন্ন সামরিক অবকাঠামো, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার কেন্দ্র, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সরঞ্জামসহ বহু লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত শতাধিক স্থাপনা এই হামলার আওতায় এসেছে।
ইরানি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, এসব হামলায় কয়েকজন সামরিক সদস্য ও বেসামরিক ব্যক্তি হতাহত হয়েছেন। তবে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সাম্প্রতিক সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালির সামুদ্রিক বাণিজ্যে। আন্তর্জাতিক শিপিং পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিনের মধ্যে এই জলপথে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় অনেক বাণিজ্যিক জাহাজ বিকল্প রুট ব্যবহার করছে অথবা সাময়িকভাবে চলাচল স্থগিত রেখেছে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ এই প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হওয়ায় পরিস্থিতি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান অস্থায়ী সমঝোতা চুক্তির আওতায় যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক আলোচনার উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। তেহরান অভিযোগ করেছে, ওয়াশিংটন চুক্তির বিভিন্ন শর্ত লঙ্ঘন করেছে। ফলে প্রতিশ্রুতি রক্ষা না হলে তারাও চুক্তি মানতে বাধ্য নয় বলে জানিয়েছে।
অন্যদিকে কাতার, পাকিস্তান ও মিসরসহ কয়েকটি দেশ মধ্যস্থতার মাধ্যমে দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে ফেরানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্ববাজারে সংঘাতের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে জ্বালানি খাতে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দেখা দিলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি, পরিবহন খাত এবং শিল্প উৎপাদনও নেতিবাচক প্রভাবের মুখে পড়তে পারে।
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাম্প্রতিক সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। পাল্টাপাল্টি হামলা, কূটনৈতিক অচলাবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে ঝুঁকি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত স্থিতিশীল না হলে এর প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদে অনুভূত হতে পারে।
