চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেলপথের ৫৯.৯৩ কিলোমিটার অংশকে ডুয়েল গেজে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে দেশের উত্তর, পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলের রেল যোগাযোগ আরও কার্যকর হওয়ার পাশাপাশি দক্ষিণ চট্টগ্রামে শিল্প, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বাড়বে।
চট্টগ্রাম-দোহাজারী বিদ্যমান মিটারগেজ রেলপথকে ডুয়েল গেজে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ৫৯ দশমিক ৯৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ উন্নত হলে একই লাইনে মিটারগেজ ও ব্রডগেজ—দুই ধরনের ট্রেন চলাচল করতে পারবে। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পণ্য ও যাত্রী পরিবহন আরও সহজ হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সোমবার (১৭ আগস্ট) পটিয়া পৌরসভা সম্মেলন কক্ষে প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ (ইআইএ) নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এসব তথ্য জানানো হয়।
সভায় জানানো হয়, প্রকল্পের আওতায় শুধু রেললাইন সম্প্রসারণ নয়, বিদ্যমান সেতু, কালভার্ট, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, স্টেশন, প্ল্যাটফর্ম, লুপ লাইন, লেভেল ক্রসিং, সিগন্যালিং ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থারও উন্নয়ন করা হবে। পাশাপাশি রেল চলাচলের নিরাপত্তা অবকাঠামো আধুনিকায়ন করা হবে।
প্রকল্প পরিচালক মো. আসাদুল হক বলেন, চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেলপথ ডুয়েল গেজে রূপান্তর হলে দেশের রেল যোগাযোগের সক্ষমতা বাড়বে। এর ফলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে সময় এবং ব্যয় দুটোই কমবে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ আরও কার্যকর হবে।
তিনি বলেন, দক্ষিণ চট্টগ্রামের শিল্প, কৃষি, পর্যটন ও বাণিজ্য খাতে এ প্রকল্প নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। তবে উন্নয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় মানুষের মতামত ও উদ্বেগ বিবেচনায় নিয়েই চূড়ান্ত ইআইএ প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হবে।
সভায় প্রকল্পসংশ্লিষ্ট পরিবেশ বিশেষজ্ঞ মো. গিয়াস উদ্দিন বলেন, নির্মাণকাজের সময় পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব কমাতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হবে। ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত পানি ছিটানো, শব্দদূষণ কমানো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের আশপাশে শব্দের গ্রহণযোগ্য মাত্রা বজায় রাখার কথাও জানান তিনি। প্রয়োজন ছাড়া উচ্চ শব্দ সৃষ্টিকারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হবে না। কোনো গাছ কাটার প্রয়োজন হলে প্রতিটি গাছের বিপরীতে অন্তত তিনটি করে নতুন গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন অনুসরণ করে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। জমি, স্থাপনা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, গাছপালা ও ফসলের ক্ষতিও ক্ষতিপূরণের আওতায় বিবেচনা করা হবে।
এ ছাড়া স্থানীয় মানুষের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থাপনা কমিটি (জিআরসি) গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। কমিটিতে বাংলাদেশ রেলওয়ে, উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় এনজিও প্রতিনিধিদের রাখা হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমান বলেন, বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় পরিবেশের ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখতে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেওয়া হবে।
সভায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়ী নেতারা প্রকল্পটিকে স্বাগত জানান। তাঁদের মতে, ডুয়েল গেজ রেলপথ চালু হলে দক্ষিণ চট্টগ্রামে যাত্রীসেবার মান বাড়ার পাশাপাশি শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। চট্টগ্রাম বন্দরনির্ভর শিল্পের কাঁচামাল এবং কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ ও তুলনামূলক কম খরচে করা সম্ভব হবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা অবশ্য প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ভূমি অধিগ্রহণ, জলাবদ্ধতা, শব্দদূষণ এবং মানুষের স্বাভাবিক যাতায়াতের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখার দাবি জানিয়েছেন। পরিবেশসচেতন ব্যক্তিরা বৃক্ষনিধন, বায়ু ও শব্দদূষণ এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব কমাতে কার্যকর পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানান।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সড়কপথের ওপর চাপ কমতে পারে। একই সঙ্গে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমার পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা শক্তিশালী হবে। নির্মাণ ও পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমেও স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
অংশগ্রহণকারীরা আশা প্রকাশ করেন, পরিবেশ ও জনস্বার্থের বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনায় রেখে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের যোগাযোগব্যবস্থা, শিল্প-বাণিজ্য, পর্যটন ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের রেল যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হবে।
