৩৫ বছর পর আজ বৃহস্পতিবার আবারও রাষ্ট্রপতি পদে ভোট হতে যাচ্ছে। জাতীয় সংসদের সংসদকক্ষে বেলা দুইটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ হবে। নির্বাচনে ভোটার ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য। দুই প্রার্থীর মধ্যে ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্যের সমর্থন পাওয়ায় তাঁর জয় কার্যত নিশ্চিত।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মির্জা ফখরুলের প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। জাতীয় সংসদে বিএনপির সদস্য ২৪৭ জন। অন্যদিকে ১১-দলীয় ঐক্যের সংসদ সদস্য ৯০ জন। এই সংখ্যাগত ব্যবধানের কারণে ফলাফল অনেকটাই নির্ধারিত হলেও দুজন প্রার্থী থাকায় আইন অনুযায়ী ভোট গ্রহণ করতে হচ্ছে।
১৯৯১ সালে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর একই বছর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা ভোট দিয়েছিলেন। এরপর টানা সাতজন রাষ্ট্রপতি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ফলে এবার দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গোপন ব্যালটে হবে না। সংসদ সদস্যরা ব্যালটে পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে নিজের পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করবেন। তাঁরা নিজ নিজ আসনে বসেই ভোট দেবেন।
প্রথমে ব্যালট পেপারের মুড়ি অংশে পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করার পর ব্যালট গ্রহণ করবেন একজন সংসদ সদস্য। এরপর মূল ব্যালটে পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে নির্ধারিত স্থানে আবারও পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করতে হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচনী কর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। জাতীয় সংসদের অধিবেশন বর্তমানে চলমান না থাকায় ভোট গ্রহণের জন্য সংসদ সদস্যদের আলাদা বৈঠক ডাকা হয়েছে। ওই বৈঠকে সভাপতিত্বের পাশাপাশি নির্বাচন পরিচালনাও করবেন সিইসি।
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনরত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল সংসদ সদস্য হিসেবে ভোট দিতে পারবেন। তাঁদের জন্য সংসদ কক্ষে আলাদা আসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে সংসদ সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে।
বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেও সংসদ সদস্য হওয়ায় ভোট দিতে পারবেন। তবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের দিন তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য হয়ে যাবে। অন্যদিকে অলি আহমদ সংসদ সদস্য নন। ফলে তিনি নিজে ভোট দিতে পারবেন না।
সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন গতকাল বুধবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ভোট শুরুর সময় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনরত স্পিকার ও প্রধানমন্ত্রীর ভোটদান বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। এরপর সম্প্রচার বন্ধ থাকবে। ভোট গণনার সময় আবার সরাসরি সম্প্রচার শুরু হবে।
গণনা শেষ হওয়ার পর সংসদ কক্ষেই ফল ঘোষণা করবেন নির্বাচনী কর্তা সিইসি। পরে নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা হবে।
সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসনসহ জাতীয় সংসদে মোট আসন ৩৫০টি। তবে আদালতের নির্দেশের কারণে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফল এখনো ঘোষণা হয়নি। এ কারণে বর্তমানে সংসদ সদস্য ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার ৩৪৯ জন।
ক্ষমতাসীন বিএনপির সংসদ সদস্য ২৪৭ জন। দলটির মিত্র বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), গণ অধিকার পরিষদ ও গণসংহতি আন্দোলনের একজন করে সংসদ সদস্য রয়েছেন।
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের সংসদ সদস্য ৯০ জন। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর ৭৭ জন এবং জামায়াতের সমর্থনে নির্বাচিত জাগপার একজন সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য রয়েছেন। এ ছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আটজন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের তিনজন এবং খেলাফত মজলিসের একজন সংসদ সদস্য রয়েছেন।
এর বাইরে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একজন এবং স্বতন্ত্র আটজন সংসদ সদস্য রয়েছেন। বিএনপি স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের কাছেও ভোট চেয়েছে বলে জানা গেছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সংসদ সদস্য ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন। তাঁর পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ায় সংবিধান অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৬ আগস্ট নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন।
নতুন রাষ্ট্রপতি আগামীকাল শুক্রবার সন্ধ্যা সাতটায় বঙ্গভবনে শপথ নেবেন বলে জানিয়েছেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।
১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। বিএনপি ১৪০টি এবং আওয়ামী লীগ ৮৮টি আসন পেয়েছিল। জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করে। ওই বছর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে জয়ী হন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট।
এরপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী দলগুলো আর প্রার্থী দেয়নি। ফলে ভোট গ্রহণের প্রয়োজন হয়নি এবং পরবর্তী সাতজন রাষ্ট্রপতি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
এবার বিরোধী জোট প্রার্থী দেওয়ায় দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আবারও সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার প্রক্রিয়া অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা ভোট দেবেন। তাঁর ভাষ্য, ১৯৯১ সালের পর এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট হচ্ছে এবং এর মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা শুরু হবে।
