ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদকক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হবে এবং শনিবার নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশের সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান হলেও নির্বাহী ক্ষমতার মূল কেন্দ্র প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা। ফলে সংবিধানে রাষ্ট্রপতির জন্য নির্ধারিত অধিকাংশ ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শনির্ভর। তবে সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা, সংসদে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাব কিংবা কোনো সাংবিধানিক সংকট দেখা দিলে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
১৯৯১ সালে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর থেকে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি নিজস্ব বিবেচনাবোধ প্রয়োগ করতে পারেন। এ দুটি ক্ষেত্র ছাড়া অন্য সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের সময় তাকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুসরণ করতে হয়।
সংবিধানের ৫৬(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে এমন ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করবেন রাষ্ট্রপতি, যিনি সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন বলে তার কাছে প্রতীয়মান হন। ফলে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বা জোটের নেতা, অথবা তাদের মনোনীত ব্যক্তিই সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পান।
রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে সংসদ আহ্বান ও স্থগিত করা, সংসদ ভেঙে দেওয়া, সংসদে পাস হওয়া বিলে সম্মতি প্রদান, জরুরি অবস্থা ঘোষণা, রাষ্ট্রদূত নিয়োগ, যুদ্ধ ঘোষণা, শান্তিচুক্তির অনুমোদন এবং দণ্ডিত ব্যক্তিকে ক্ষমা প্রদর্শন।
তবে এসব ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুসরণ করতে হয়। সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে আরও বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে কোনো পরামর্শ দিয়েছেন কি না কিংবা দিয়ে থাকলে সেই পরামর্শ কী ছিল, তা নিয়ে কোনো আদালত প্রশ্ন তুলতে পারবে না।
অর্থাৎ, স্বাভাবিক রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা মূলত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
তবে রাষ্ট্রপতির পদকে পুরোপুরি আনুষ্ঠানিক বা ক্ষমতাহীন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সংসদে কোনো দল বা জোট স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে কিংবা সরকার গঠন নিয়ে জটিলতা দেখা দিলে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব সামনে আসে। এমন পরিস্থিতিতে কে সরকার গঠনের সুযোগ পাবেন, তা নির্ধারণে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও সংকটময় সময়ে রাষ্ট্রপতিকে তুলনামূলকভাবে স্বাধীনভাবে সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে দেখা গেছে। ফলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক সময়ে তার সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি বিশেষ পরিস্থিতিতে তার ভূমিকার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হয়।
সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত হলেও সাংবিধানিক সংকটের মুহূর্তে তাঁর সিদ্ধান্ত রাষ্ট্র পরিচালনার পরবর্তী গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
