মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী নাটালি হার্পকে ঘিরে হোয়াইট হাউস ও মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাঁর সার্বক্ষণিক উপস্থিতি, সরাসরি যোগাযোগ এবং প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে থেকেও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগই এ আলোচনার মূল কারণ। ২০২৩ সালের অক্টোবরের একটি ঘটনা সামনে আসার পর নাটালির সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতার ধরন নিয়েও নতুন প্রশ্ন উঠেছে।
ঘটনাটি ঘটে ট্রাম্পের নিউইয়র্কের আদালতে হাজিরার সময়। ওই সময় নিজের বিরুদ্ধে চলা একাধিক মামলার শুনানিতে অংশ নিতে ট্রাম্প টাওয়ার থেকে আদালতের উদ্দেশে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ট্রাম্প। তবে তাঁর গাড়িবহরে নাটালির জন্য কোনো আসন রাখা হয়নি।
ঘটনার সঙ্গে পরিচিত দুই সূত্রের বরাতে জানা যায়, এ নিয়ে ট্রাম্প টাওয়ারের লবিতে নাটালি ও কয়েকজন কর্মীর মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। নাটালি দাবি করেন, ট্রাম্প নিজেই তাঁকে আদালতের শুনানিতে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। গাড়িতে জায়গা না থাকলেও তিনি সরে যেতে রাজি হননি। পরে গাড়িবহরের একটি গাড়ির পেছনের খালি অংশে উঠে বসেন তিনি।
সে সময় ঘটনাটি প্রকাশ্যে না এলেও সম্প্রতি বিষয়টি সামনে আসায় ট্রাম্পের সঙ্গে নাটালির ঘনিষ্ঠতা ও তাঁর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা তীব্র হয়েছে।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ এক সূত্রের দাবি, নাটালির কাজের ধরন অনেক সময় প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ সহযোগীদের বিরক্ত করেছে। এমনকি তাঁকে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বলয় থেকে দূরে রাখার চেষ্টাও হয়েছে কখনো কখনো। তবে হোয়াইট হাউসের এক উপদেষ্টা বলেছেন, ট্রাম্প নাটালির অতিরিক্ত মনোযোগ ও আনুগত্যকে পছন্দ করেন।
নাটালির সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতার সূত্রপাত কয়েক বছর আগে। ডানপন্থী একটি টেলিভিশন চ্যানেলের সাবেক উপস্থাপিকা নাটালি ২০২২ সালে ট্রাম্পের কর্মী বাহিনীতে যোগ দেন। পরে তিনি ট্রাম্পকে তাঁর জীবন রক্ষার কৃতিত্ব দেন। এরপর ধীরে ধীরে প্রেসিডেন্টের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলয়ের সদস্য হয়ে ওঠেন তিনি।
ট্রাম্পের হয়ে নানা ধরনের কাজ করেন নাটালি। মিত্রদের বার্তা প্রেসিডেন্টের কাছে পৌঁছে দেওয়া, বৈঠকের আয়োজন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট তৈরিতে সহায়তা এবং ট্রাম্পের প্রশংসা করে লেখা বিভিন্ন নথি ও চিঠি তাঁর কাছে পৌঁছে দেওয়ার মতো দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
ট্রাম্পের কাছে ইতিবাচক খবর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট ও বিভিন্ন চিঠিপত্র নিয়মিত পৌঁছে দেওয়ার কারণে সহযোগীদের মধ্যে নাটালি ‘মানব প্রিন্টার’ নামে পরিচিত হয়েছেন।
এক রিপাবলিকান আইনপ্রণেতার ভাষ্য, তাঁরা অনেক সময় সরাসরি ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও নাটালিকে বিষয়টি জানিয়ে রাখেন। কারণ, তিনি দ্রুত সাড়া দেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য প্রেসিডেন্টের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। একই সঙ্গে আইনপ্রণেতাদের কাছেও বিভিন্ন নিবন্ধ ও নোট পাঠান নাটালি।
ওভাল অফিসেও প্রায়ই দেখা যায় নাটালিকে। বিভিন্ন চুক্তি স্বাক্ষর বা অনুষ্ঠানের ভিডিও পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ট্রাম্প যখন বক্তব্য দিচ্ছেন, তখন কক্ষের এক পাশে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। কখনো তাঁকে হাসতে কিংবা সম্মতিসূচকভাবে মাথা নাড়তেও দেখা যায়।
ট্রাম্পের জনসভা ও বিভিন্ন সফরেও প্রেসিডেন্টের কাছাকাছি থাকেন নাটালি। কোনো তথ্য বা নথি খুঁজে দিতে বললে দ্রুত কাজ শেষ করায় ট্রাম্প মাঝেমধ্যে তাঁর মিত্রদের কাছে নাটালির কাজের গতির প্রশংসা করেছেন বলেও জানা গেছে।
তবে নাটালির এই সর্বক্ষণিক উপস্থিতি হোয়াইট হাউসের সবাই স্বাভাবিকভাবে নেননি। ট্রাম্পের কয়েকজন উপদেষ্টা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে একান্ত বৈঠকে গিয়ে নাটালিকেও সেখানে উপস্থিত দেখতে পেয়েছেন। এতে তাঁদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি।
কাজের বিষয়ে অবগত একটি সূত্রের দাবি, ৩৫ বছর বয়সী নাটালি অন্যদের কাছে নিজেকে শুধু ট্রাম্পের কাছেই জবাবদিহি করেন বলে উল্লেখ করেন। হোয়াইট হাউসের প্রশাসনিক কাঠামো ও প্রচলিত দায়িত্ব বণ্টনের বাইরে এমন অবস্থান নিয়ে অন্য কর্মীদের মধ্যেও বিরক্তি তৈরি হয়েছে বলে সূত্রটি জানিয়েছে।
অবশ্য হোয়াইট হাউস এসব অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে না। একজন কর্মকর্তা বলেছেন, নাটালি অধিকাংশ সহকর্মীর সঙ্গে ভালোভাবে কাজ করেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে দেন।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ডেভিস ইঙ্গলও নাটালির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, নাটালি ট্রাম্পের দলের অন্যতম অনুগত ও পরিশ্রমী সহকারী।
সম্প্রতি ডেমোক্রেটিক দলের সিনেটর জন অসফ ট্রাম্প ও নাটালিকে নিয়ে মন্তব্য করার পর বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে। ট্রাম্পকে কটাক্ষ করতে গিয়ে তিনি নাটালির নাম উল্লেখ করেন এবং কাতারের আমিরের উপহার দেওয়া উড়োজাহাজে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ভ্রমণের প্রসঙ্গ তোলেন।
ইরানের হুমকির মধ্যে গত জুলাইয়ে ট্রাম্প যখন একটি ছোট উড়োজাহাজে করে গোপনে তুরস্ক ছাড়েন, তখন সীমিতসংখ্যক যে সহযোগী তাঁর সঙ্গে ছিলেন, তাঁদের মধ্যে নাটালির উপস্থিতির বিষয়টির দিকেই অসফ ইঙ্গিত করেন।
অসফের মন্তব্যের পর হোয়াইট হাউস থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠরা তাঁর বক্তব্যকে অপমানজনক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে সমালোচনা করেন।
ট্রাম্প ও নাটালির সম্পর্ককে কীভাবে দেখা উচিত, তা নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। তাঁদের দুজনকে কাছ থেকে চেনেন এমন এক ব্যক্তির দাবি, তাঁদের সম্পর্ক মূলত ‘বাবা-মেয়ের’ মতো।
তবে নাটালির অস্বাভাবিক প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন তোলা ব্যক্তিরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক বিতর্কের পর হোয়াইট হাউসে তাঁর অবস্থান এবং প্রেসিডেন্টের ওপর তাঁর প্রভাব কতটা অটুট থাকে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাম্প প্রশাসনের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের তালিকায় নাটালি হার্পের নাম না থাকলেও প্রেসিডেন্টের দৈনন্দিন কার্যক্রমে তাঁর দৃশ্যমান উপস্থিতি এবং ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তাঁকে বিশেষ অবস্থানে নিয়ে গেছে। এ কারণেই হোয়াইট হাউসের ভেতরে ও বাইরে তাঁর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা ক্রমেই বাড়ছে।
