অধিকৃত পশ্চিম তীরে বিতর্কিত ‘ই–ওয়ান’ এলাকায় ১ হাজার ২০০টির বেশি আবাসন ইউনিট নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে ইসরায়েল। জেরুজালেমের কাছে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে পশ্চিম তীর উত্তর ও দক্ষিণ অংশে বিভক্ত হয়ে যেতে পারে। এতে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের মাধ্যমে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে ফিলিস্তিন ও বিভিন্ন দেশ।
ইসরায়েলের আবাসন মন্ত্রণালয় ই–ওয়ান এলাকায় নতুন আবাসন নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে। পরিকল্পনাটির লক্ষ্য পূর্ব জেরুজালেম থেকে পশ্চিম তীর পর্যন্ত ইহুদি বসতিগুলোর একটি ধারাবাহিক ব্লক তৈরি করা। এতে পশ্চিম তীরের ভৌগোলিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পাশাপাশি পূর্ব জেরুজালেমও পশ্চিম তীরের অন্য অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। সম্ভাব্য ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে পূর্ব জেরুজালেমকে বিবেচনা করা হয়।
ইসরায়েলে আগামী অক্টোবরের শেষে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। এর এক সপ্তাহ আগে নতুন আবাসন নির্মাণের দরপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা শেষ হবে।
ইসরায়েলি বসতি পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন পিস নাউ গত মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘এটি শেষ মুহূর্তের একটি পদক্ষেপ। (নেতানিয়াহু) সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলে সংঘাত ও রক্তপাত চলমান রাখার নীতি হিসেবে এটি করা হচ্ছে।’
আন্তর্জাতিক চাপ ও সমালোচনার কারণে বছরের পর বছর জেরুজালেমের কাছের ই–ওয়ান এলাকায় ইসরায়েল কোনো পরিকল্পনা বা নির্মাণকাজ এগিয়ে নেয়নি। তবে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের অনুমোদন দ্রুত এগিয়ে নিয়েছে।
বসতি স্থাপন কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর কয়েকটি পশ্চিমা দেশ নিষেধাজ্ঞাও দিয়েছে। গত মে মাসে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানিসহ কয়েকটি পশ্চিমা দেশ বিভিন্ন কোম্পানিকে পশ্চিম তীর ও ই–ওয়ান এলাকায় বসতি নির্মাণে অংশ না নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করে। এ ক্ষেত্রে তারা ‘আইনি ও সুনামগত ঝুঁকির’ কথা উল্লেখ করে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, যুক্তরাজ্য, নরওয়ে ও নেদারল্যান্ডসের নেতারা যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েলের পদক্ষেপের বিষয়ে সতর্কতা পুনর্ব্যক্ত করেন।
তাঁরা বলেন, ‘পশ্চিম তীরে এখন গুরুতর অস্থিতিশীল পরিস্থিতি চলছে। বেসামরিক মানুষের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের নজিরবিহীন সহিংসতা ও ফিলিস্তিনি অর্থনীতির ওপর কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত আরও উদ্বেগজনক।’
ইসরায়েল গত বছর ই–ওয়ান পরিকল্পনার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। দেশটির কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ তখন বলেছিলেন, ‘স্লোগান দিয়ে নয়, পদক্ষেপের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের বিষয়টি আলোচনার টেবিল থেকে মুছে দেওয়া হচ্ছে।’
ই–ওয়ান পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে ‘অগ্রহণযোগ্য ও ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপ’ বলেছেন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড। নিষেধাজ্ঞাসহ অন্যান্য পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়ে এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান ধ্বংস করা হচ্ছে। যুক্তরাজ্য তা মেনে নেবে না।’
এর জবাবে ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সার গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘ইহুদি জনগণ তাদের ঐতিহাসিক ছোট্ট মাতৃভূমির কোথায় বসবাস করতে পারবে, সে বিষয়ে যুক্তরাজ্যের উপদেশ দেওয়া হাস্যকর।’
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের সব বসতিকে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অবৈধ বলে মনে করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘের অধিকাংশ সদস্য। তবে এই অবস্থানের মধ্যেও গত কয়েক বছরে অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা অনুমোদনহীন কয়েক ডজন বসতি গড়ে তুলেছেন। পরে এসব বসতির জন্য ইসরায়েল সরকারের অনুমোদনও আদায় করা হয়েছে।
জাতিসংঘে নিয়োজিত ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত রিয়াদ মনসুর ই–ওয়ান এলাকায় নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক, দায়িত্বজ্ঞানহীন ও হুমকিস্বরূপ’ বলে মন্তব্য করেছেন। সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘এটি অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।’
মিসরও ইসরায়েলের দরপত্র আহ্বানের তীব্র সমালোচনা করেছে। একই সঙ্গে পরিকল্পনাটি বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে দেশটি।
এক বিবৃতিতে মিসর বলেছে, ‘অবৈধভাবে বসতি সম্প্রসারণ এবং অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের আইনগত মর্যাদা ও জনমিতিক (জনসংখ্যার গঠন) কাঠামো পরিবর্তনের মাধ্যমে বাস্তবতা চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা আমরা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করছি। এসব পদক্ষেপ দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বাস্তবায়নের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।’
ই–ওয়ান এলাকায় নতুন বসতি নির্মাণের এই উদ্যোগের ফলে পশ্চিম তীরের ভৌগোলিক বিভাজন আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ কারণে ইসরায়েলের পদক্ষেপটি শুধু নতুন আবাসন নির্মাণের বিষয় নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের ভবিষ্যৎ নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
