ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর আগে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিল। তবে সেই সতর্কতা উপেক্ষা করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পরামর্শে ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলার নির্দেশ দেন ট্রাম্প। ছয় সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও সংঘাত এখন প্রায় ছয় মাসে গড়িয়েছে এবং এর সমাপ্তির কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে প্রথম আলো জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন আগে ট্রাম্প ওভাল অফিসে তৎকালীন জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ডকে ডেকে পাঠান। উদ্দেশ্য ছিল ইরানে পূর্ণমাত্রার হামলা চালানো কতটা যুক্তিযুক্ত হবে, সে বিষয়ে গোয়েন্দা মূল্যায়ন জানা।
গ্যাবার্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছিলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করা হলে দেশটিতে আরও কঠোরপন্থী একটি সরকার ক্ষমতায় আসতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ইরান দ্রুত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনী ও তাদের অংশীদারদের ওপর হামলা চালাতে পারে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের মধ্যেও আস্থার সংকট দেখা দিতে পারে।
সামরিক কর্মকর্তারাও ট্রাম্পকে একই ধরনের সতর্কতা দিয়েছিলেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ মার্কিন সেনাদের প্রাণহানি ঘটাবে, অস্ত্রের মজুত কমিয়ে দেবে এবং আগে থেকেই চাপের মধ্যে থাকা মার্কিন সামরিক সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে।
তবে এসব সতর্কতার মধ্যেই নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ এক সহকারী তাঁকে বোঝান যে ইরান কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। তাঁদের মতে, এই পরিস্থিতি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস এবং ট্রাম্পের ‘শান্তিদূত’ হিসেবে রাজনৈতিক ভাবমূর্তি শক্তিশালী করার বিরল সুযোগ তৈরি করেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি হামলা শুরুর পর ইসরায়েল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিকে হত্যা করেছে—এ খবর পেয়ে ট্রাম্প উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন। সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ ও ইরানবিষয়ক প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ মার-এ-লাগোতে একটি তহবিল সংগ্রহ অনুষ্ঠানে তাঁকে খবরটি জানান। পরে ট্রাম্প উপস্থিত অতিথিদেরও বিষয়টি জানান এবং সেখানে করতালি ও উল্লাস শুরু হয়।
কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই উচ্ছ্বাসের জায়গা নেয় সংশয়। মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেলের মজুত কমে আসে এবং গোলাবারুদের মজুতের ওপর চাপ বাড়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামরিক অভিযানে প্রায় ৩ হাজার ইরানি এবং ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। আরও ৭৫৬ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে পেন্টাগন।
যুদ্ধ শুরুর পর ট্রাম্প ছয় সপ্তাহের মধ্যে সংঘাত শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হয়েছে। ১৭ জুন একটি অন্তর্বর্তীকালীন শান্তিচুক্তির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং ৬০ দিনের পারমাণবিক আলোচনার পথ তৈরি হয়।
তবে চুক্তির পর তেহরান আবারও হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করে। এতে ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হন। ৬০ দিনের পারমাণবিক আলোচনার সময়সীমা ১৭ আগস্ট শেষ হয়ে গেলেও কোনো স্থায়ী সমাধান আসেনি।
এরপর যুক্তরাষ্ট্র আবার অর্থনৈতিক চাপের কৌশলের দিকে এগোয়। অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানান, ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর আওতায় ইরানের সরকারের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ যুদ্ধ শুরুর প্রায় ছয় মাস পর ইরানের সরকার পরিবর্তনের পুরোনো কৌশলই আবার সামনে এসেছে।
এদিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দেশটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। নিহত আলী খামেনির স্থলাভিষিক্ত সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নেতৃত্বাধীন সরকারও নতি স্বীকারের কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না।
সাবেক মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, ট্রাম্প এমন একটি চুক্তি চান, যাতে দীর্ঘমেয়াদে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম বন্ধ থাকে এবং একই সঙ্গে তাঁকে সফল যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। কিন্তু যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়েছে।
নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভের ডেপুটি ভাইস প্রেসিডেন্ট এরিক ব্রিউয়ারের মতে, যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতির অনেক কিছুই আগে থেকে অনুমান করা হয়েছিল এবং এর পূর্বাভাসও দেওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য পেন্টাগন ট্রাম্পকে নিরপেক্ষ ও সঠিক তথ্য সরবরাহ করেছে।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়ছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সংঘাতটি রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে। একই সময়ে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার সূচকও তাঁর বর্তমান প্রেসিডেন্ট মেয়াদের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সূত্র: দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট,
