শৈবাল-গ্রিন মাসেল চাষে সম্ভাবনা, বাজার সংকটে থমকে উদ্যোক্তারা

শৈবাল-গ্রিন মাসেল চাষে সম্ভাবনা, বাজার সংকটে থমকে উদ্যোক্তারা

কক্সবাজারের খুরুশকুল-মহেশখালী চ্যানেলের উপকূলে সামুদ্রিক শৈবাল ও গ্রিন মাসেল চাষে সম্ভাবনা থাকলেও বাজার সংকট, অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা ও পরিকল্পনার অভাবে পিছিয়ে পড়ছেন উদ্যোক্তারা। উৎপাদন ভালো হলেও স্থায়ী ক্রেতা, প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও রপ্তানি চেইন না থাকায় অনেক সময় উৎপাদিত শৈবাল ও ঝিনুক নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরের এই উপকূলে জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে সামুদ্রিক শৈবাল ও গ্রিন মাসেল চাষ হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিতভাবে খাতটির উন্নয়ন করা গেলে এটি স্থানীয় মানুষের আয়ের নতুন উৎস হতে পারে।

স্থানীয় উদ্যোক্তা আনোয়ার মিয়া বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর ২০১৮ সালে চাকরি ছেড়ে শৈবাল চাষ শুরু করেন।

শুরুতে কয়েকটি ভেলায় শৈবাল চাষ করলেও পরে এর সঙ্গে গ্রিন মাসেল বা সবুজ ঝিনুক এবং কোরাল মাছ যুক্ত করেন তিনি। একই ভেলায় তিন ধরনের উৎপাদনের সমন্বিত মডেল গড়ে তোলেন আনোয়ার।

জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভরশীল এ পদ্ধতিতে বর্তমানে ভালো ফলন পাওয়া যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। খরচ তুলনামূলক কম এবং রোগবালাইও কম হওয়ায় পদ্ধতিটি উদ্যোক্তাদের কাছে সম্ভাবনাময় হয়ে উঠেছে।

তবে আনোয়ারের প্রধান সমস্যা বাজার। তার ভাষায়, উৎপাদন হলেও সব সময় তা বিক্রি করা সম্ভব হয় না। ফলে অনেক সময় শৈবাল ও ঝিনুক নষ্ট হয়ে লোকসান হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে শৈবালের ব্যবহার খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনী, টেক্সটাইল ও বায়োটেক শিল্পে বাড়ছে। গ্রিন মাসেলেরও পুষ্টিগুণের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা রয়েছে।

তবে খুরুশকুলের চাষিদের জন্য বড় সমস্যা হলো বাজারব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। এখানে স্থায়ী ক্রেতা, প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, সংরক্ষণাগার ও রপ্তানি চেইন নেই। ফলে উৎপাদিত পণ্যের একটি অংশ অবিক্রীত থেকে যায় এবং সময়মতো বিক্রি করতে না পারায় শৈবাল ও ঝিনুক নষ্ট হয়ে যায়।

উদ্যোক্তাদের ভাষায়, উৎপাদনের চেয়ে বড় সমস্যা এখন পণ্য বিক্রি করা।

এই খাতে নারীদের অংশগ্রহণও বাড়ছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, কক্সবাজার জেলায় প্রায় এক হাজার চাষি শৈবাল উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। তাদের বড় অংশ নারী।

নুনিয়াছড়া, রেজুখাল, সোনাদিয়া ও শাহপরীর দ্বীপসহ বিভিন্ন এলাকায় নারীরা শৈবাল চাষ করছেন। মরিয়ম, আনোয়ারা ও মমতাজের মতো নারীরা এ চাষের মাধ্যমে পরিবারের জন্য নতুন আয়ের উৎস তৈরি করেছেন।

মরিয়ম বলেন, আগে সংসারে আর্থিক সংকট ছিল। শৈবাল চাষ থেকে আয় হলেও প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় লাভ কমে যাচ্ছে।

প্রতিবেদনে শৈবাল চাষের দুটি পদ্ধতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে—লং লাইন ও ভাসমান ভেলা পদ্ধতি।

লং লাইন পদ্ধতিতে দড়ির নির্দিষ্ট দূরত্বে শৈবালের চারা বেঁধে পানিতে ভাসিয়ে রাখা হয়। আর ভাসমান ভেলা পদ্ধতিতে বাঁশ বা পাইপের ভেলায় দড়ি ঝুলিয়ে চাষ করা হয়।

নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চাষের মৌসুম। সাধারণত ১৫ থেকে ২১ দিনের মধ্যে প্রথম ফসল পাওয়া যায়। প্রায় ৯ কেজি ভেজা শৈবাল শুকিয়ে ১ কেজি হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাজা শৈবালের কেজিপ্রতি দাম ১০০ থেকে ১৫০ টাকা এবং শুকনা শৈবালের দাম ৩০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে মৌসুমে উৎপাদন বেশি হলে দাম কমে যায়।

২০১৬ সাল থেকে শৈবাল চাষ নিয়ে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়। এতে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা যুক্ত রয়েছে।

চাষিদের প্রশিক্ষণ, চারা ও উপকরণ দেওয়া হলেও ধারাবাহিকতা এবং বাজারসংযোগের অভাব এখনো বড় সমস্যা হয়ে আছে।

কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আকতারুজ্জামান জানান, বীজ উৎপাদনেও ঘাটতি রয়েছে। পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা না থাকায় চাহিদা অনুযায়ী বীজ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না।

তার মতে, বিশ্ববাজারে শৈবালের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। চীন, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া এ খাতে এগিয়ে রয়েছে।

কক্সবাজারের উদ্যোক্তা মারিয়া রে শৈবালকে ব্যবহার করে সাবান, গুঁড়া, স্যুপ ও বিভিন্ন খাবার তৈরি করছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে তিনি প্রায় দুই লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করেছেন।

বর্তমানে দেড় একর জমিতে শৈবাল চাষ করছেন তিনি এবং ৩০ লাখ টাকার পণ্য বিক্রির লক্ষ্য নিয়েছেন। তার খামারে স্থানীয় নারীরাও কাজ করছেন।

বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মীর কাশেমের মতে, শৈবাল শুধু অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়, পরিবেশের জন্যও উপকারী।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতি কেজি শৈবাল প্রায় ০.৭ কেজি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে। পাশাপাশি এটি সমুদ্রের পানি পরিষ্কার রাখতে এবং জলজ প্রাণীর আবাসস্থল তৈরিতে সহায়তা করে। এ কারণে শৈবালকে ‘ব্লু কার্বন’ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তাদের মতে, এ খাত এগিয়ে নিতে প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, কোল্ড স্টোরেজ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণ, রপ্তানি বাজার তৈরি, স্থানীয় বাজারে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং গভীর সমুদ্রে বছরব্যাপী চাষের উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, খুরুশকুলের উপকূলে একদিকে সম্ভাবনা থাকলেও অন্যদিকে রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। তার মতে, উদ্যোক্তাদের এগিয়ে নিতে নীতিগত সহায়তা, পরিকল্পিত বিনিয়োগ এবং নিশ্চিত বাজার প্রয়োজন।

এগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে খুরুশকুলের উপকূল বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *