স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্যে অসন্তুষ্ট বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটি দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনে নিয়োগ পাওয়া বিএনপির প্রশাসকেরা যাতে নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে বাড়তি সুবিধা নিতে না পারেন, সে নিশ্চয়তাও চায় দলটি।
গত বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন জানিয়েছিলেন, সেপ্টেম্বরের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা দ্রুত শেষ করা সম্ভব হলে নভেম্বরের শেষ দিকে ভোট শুরু করার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। তা না হলে ডিসেম্বরের দিকে নির্বাচন শুরু হতে পারে বলে জানান তিনি।
দুর্গাপূজা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা ও আইনি বাধ্যবাধকতাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ভোটের সময় নির্ধারণ করা হবে বলেও জানান সিইসি। ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন আয়োজনের কারণে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় পেছানোর বিষয়টিও তাঁর বক্তব্যে এসেছে।
শুরুতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন এবং এরপর ধাপে ধাপে পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও জেলা পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, ডিসেম্বর কিংবা আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে নির্বাচন শুরু হতে পারে বলে বিভিন্ন সময়ে বক্তব্য দিয়েছেন।
ইসির পক্ষ থেকেও অক্টোবর থেকে নির্বাচন শুরুর প্রস্তুতির কথা বলা হয়েছিল। গত মাসে অক্টোবর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করার জন্য সরকারকে আনুষ্ঠানিক চিঠিও দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন।
জামায়াতের নেতাদের ভাষ্য, নির্বাচনের সময় নিয়ে এমন ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। নির্বাচনের দিনক্ষণ স্পষ্ট না হলে প্রার্থী বাছাই, প্রচারকৌশল এবং মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক প্রস্তুতি চূড়ান্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। কিন্তু মন্ত্রী ও সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন তারিখের কথা বলে বিভ্রান্তি তৈরি করছেন। নির্বাচন কমিশনও নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা না করায় একধরনের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে।
নির্বাচনের সময় নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তুতি চলছে। দলটির নেতারা জানিয়েছেন, প্রার্থী বাছাইসহ অনেক প্রস্তুতিই শেষ হয়েছে। ১৩টি সিটি করপোরেশনের বেশির ভাগের প্রার্থীও চূড়ান্ত করে রাখা হয়েছে। তবে তফসিল ঘোষণার আগে প্রার্থীদের নাম প্রকাশ করা হবে না।
এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের দাবি ছিল জামায়াতের। সংসদ নির্বাচনের পরও দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে দলটি। তারিখ এখনো স্পষ্ট না হলেও প্রস্তুতি থেমে নেই। প্রার্থী বাছাইসহ ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ প্রস্তুতি শেষ হয়েছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে জাতীয় নির্বাচনের পর মাঠপর্যায়ে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি যাচাইয়ের সুযোগ হিসেবেও দেখছে জামায়াত। গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে দলটি কাজ করছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে না। তাই প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগকে গুরুত্ব দিচ্ছে জামায়াত। সম্ভাব্য প্রার্থীদের সাধারণ মানুষের কাছে যাওয়া, তাঁদের সমস্যা চিহ্নিত করা এবং স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্যতা তৈরির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
জামায়াতের নেতারা জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তাঁরা এককভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে তৃণমূলে আলোচনার ভিত্তিতে ১১-দলীয় ঐক্যের মধ্যে কোনো সমঝোতা হলে এতে দলের আপত্তি থাকবে না।
১১-দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জাতীয় পর্যায়ে জোটগতভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা তাঁদের নেই। তবে স্থানীয় পর্যায়ে ১১ দল সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচন করলে দলের পক্ষ থেকে বাধা থাকবে না।
স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে বিএনপি যেসব প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে, তাঁদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ না দেওয়ার পক্ষে জামায়াত। দলটির নেতাদের মতে, প্রশাসকদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে বিএনপি নির্বাচনে অতিরিক্ত সুবিধা পেতে পারে। এতে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, স্থানীয় প্রশাসনে প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে নির্বাচন প্রভাবিত করার চেষ্টা থাকতে পারে। বিরোধী দল যাতে কোনো সুবিধা করতে না পারে, সে চেষ্টাও থাকতে পারে।
জামায়াত তাই স্থানীয় প্রশাসনে নিয়োগ পাওয়া বিএনপির প্রশাসকেরা যাতে নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে বাড়তি সুবিধা নিতে না পারেন, সে বিষয়ে নিশ্চয়তা চায়।
