কুড়িগ্রামের ধরলা নদীর চরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ঢাল এখন কৃষকদের সবজি চাষের নতুন ঠিকানা হয়ে উঠেছে। প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বাঁধের ঢালে লাউ, কলা, বাঁশ, করলাসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করছেন স্থানীয়রা। এতে একদিকে বাঁধের ঢাল ক্ষয় থেকে রক্ষা পাচ্ছে, অন্যদিকে অব্যবহৃত জমি কাজে লাগিয়ে আয় করছেন কৃষকরা।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার সারডোব থেকে ফুলবাড়ী উপজেলার খোঁচাবাড়ি বাজার পর্যন্ত বাঁধের ঢালে এ ধরনের চাষাবাদ গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে হলোখানা ও রাঙামাটি এলাকায় দীর্ঘ মাচা তৈরি করে বাণিজ্যিকভাবে লাউ চাষ করছেন কয়েকজন কৃষক।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, বাঁধের ঢালে কোথাও লাউয়ের মাচা, কোথাও বাঁশ ও কলাগাছ, আবার কোথাও বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করা হয়েছে। কোথাও কোথাও লাউয়ের মাচা প্রায় এক কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত।
হলোখানা ও রাঙামাটি গ্রামের জিয়াউল হক জিয়া, আব্দুল হাকিম ও আলতাফ হোসেন যৌথভাবে বাঁধের দুই পাশের ঢালে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে লাউ চাষ করেছেন।
জিয়াউল হক জানান, গত বছর সীমিত পরিসরে বাঁধের ঢালে লাউ চাষ করে ভালো ফলন পেয়েছিলেন। সেই সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে এবার বড় পরিসরে চাষ করেছেন। এক মাস আগে গর্তে গোবর দিয়ে উচ্চ ফলনশীল জাতের লাউয়ের চারা রোপণ করেন। পরে বাঁশ ও জিআই তার দিয়ে তৈরি করেন দীর্ঘ মাচা।
চরের এলাকায় তাপপ্রবাহের পাশাপাশি এবার অনাবৃষ্টিও রয়েছে। ফলে লাউয়ের জমিতে নিয়মিত সেচ দিতে হচ্ছে কৃষকদের। এজন্য তারা নলকূপ স্থাপনের কাজ করছেন। পাশের বিল থেকে পানি এনে চাষের জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে।
গর্তে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক সার প্রয়োগের পাশাপাশি নিয়মিত পরিচর্যাও করছেন কৃষকরা।
ইতিমধ্যে মাচা থেকে কিছু লাউ বাজারে বিক্রি শুরু হয়েছে। প্রতিটি লাউ ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। জিয়াউল হকরা এ বছর লাউ ও লাউশাক বিক্রি করে প্রায় ৩ লাখ টাকা আয়ের আশা করছেন। তাদের হিসাবে, চাষে ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ টাকা।
বাঁধের ঢাল থেকে পিকআপে করে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও বড়বাড়ির বিভিন্ন আড়তে লাউ নেওয়া হচ্ছে। সেখানে প্রতিদিন প্রায় হাজারখানেক লাউ বিক্রি হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
জিয়াউলদের পাশেই রাঙামাটি গ্রামের আশরাফুল, মফিজুল ও সোহাগ প্রায় আধা কিলোমিটারজুড়ে লাউয়ের মাচা তৈরি করেছেন। তারা সবাই ক্ষুদ্র কৃষক। এই চাষের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তারা।
অন্যদিকে পশ্চিমের হলোখানা গ্রামের আকবর আলী ও সিরাজুল ইসলাম লাউয়ের পাশাপাশি কলা, বাঁশ, করলাসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করছেন।
স্থানীয়দের মতে, বাঁধের ঢালে সবজি চাষের বিস্তার কৃষকদের মধ্যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে ভূমিহীন ও ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য অব্যবহৃত বাঁধের ঢাল চাষাবাদের সুযোগ তৈরি করেছে।
সারডোব গ্রামের বাসিন্দা এনামুল হক বলেন, গত বছর থেকেই বাঁধের ঢালে সবজি চাষ শুরু হয়েছে। এ বছর কয়েকজন কৃষক বাণিজ্যিকভাবে লাউসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করেছেন। তাদের সাফল্য দেখে অন্যরাও এ ধরনের চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
তার মতে, এতে কৃষকের পাশাপাশি স্থানীয় সবজির চাহিদা পূরণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়েছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মুন্না হক জানান, বাঁধের সুরক্ষার জন্য এ ধরনের চাষাবাদ উপকারী। তাই কৃষকদের চাষে বাধা দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি কৃষকরাও অতিরিক্ত উৎপাদনের মাধ্যমে লাভবান হচ্ছেন।
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে অনেক কৃষক বাঁধ ও সড়কের ঢালে সবজি চাষে আগ্রহী হয়েছেন। বিশেষ করে ভূমিহীন কৃষকেরা এভাবে চাষ করে লাভবান হচ্ছেন। কৃষি বিভাগ এ ধরনের উদ্যোগে কৃষকদের উৎসাহিত করছে।
