চট্টগ্রামের অভিজাত খুলশী এলাকায় একটি বহুতল ভবনে অভিযান চালিয়ে ৬৩ জন বিদেশি নাগরিককে আটক করেছে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ও খুলশী থানা পুলিশ। অভিযানে তাদের কাছ থেকে অনলাইন প্রতারণায় ব্যবহৃত ১৭০টি ডিভাইসসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, আটক বিদেশিরা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করে ডিজিটাল প্রতারণা, মাদক, এটিএম জালিয়াতি, অনলাইন ক্যাসিনো, স্বর্ণ চোরাচালান ও মানবপাচারসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত একটি আন্তর্জাতিক চক্রের সদস্য।
পুলিশ জানায়, উদ্ধার হওয়া ১৭০টি ডিভাইসের মধ্যে রয়েছে ১৩৪টি মোবাইল ফোন, ৫৭টি ল্যাপটপ, একটি অ্যাপল ট্যাব, একটি সিপিইউ, একটি স্যামসাং মনিটর, একটি কিবোর্ড, একটি মাউস ও একটি প্রিন্টার।
এ ছাড়া পাঁচটি পেনড্রাইভ, চারটি সিমকার্ড, তিনটি পাকিস্তানি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং একটি কম্বোডিয়ান এমপ্লয়মেন্ট কার্ডও উদ্ধার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাত ১১টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত খুলশীর জালালাবাদ কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর সড়কের একটি ভবনের অষ্টম তলায় অভিযান চালানো হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আটক ৬৩ জনের মধ্যে লাওসের ৩৫ জন, পাকিস্তানের ২১ জন, চীনের ৫ জন এবং নেপাল ও ভিয়েতনামের একজন করে নাগরিক রয়েছেন।
শুক্রবার বিকালে দামপাড়া পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম ও অপারেশন্স) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ।
তবে চক্রটির মূলহোতাকে এখনো গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। তাকে খুঁজে বের করতে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, আটক ব্যক্তিরা প্রায় দেড় মাস আগে কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর সড়কের একটি বাড়ি ভাড়া নিয়েছিলেন। বাড়িটি দুবাইপ্রবাসী এক ব্যক্তির বলে জানানো হয়েছে।
পুলিশের দাবি, বাড়িটি অনলাইনভিত্তিক প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ব্যবহার করা হতো। এর আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভাড়া বাসায় অবস্থান করেও চক্রটি বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও ওয়েবসাইট ব্যবহার করে প্রতারণা ও অন্যান্য অনলাইন অপরাধ চালিয়ে আসছিল।
জিজ্ঞাসাবাদে বাংলাদেশে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনায় দেশি-বিদেশি কয়েকজন সহযোগীর তথ্যও পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব সহযোগীকেও শনাক্ত ও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
পুলিশ বলছে, চক্রটি স্ক্যামিংয়ের সঙ্গেও জড়িত ছিল। সাধারণত ভুয়া পরিচয় ও মিথ্যা তথ্য ব্যবহার করে অনলাইনে অর্থ, ব্যক্তিগত তথ্য, ব্যাংক বা অনলাইন অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মতো প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডকে স্ক্যামিং বলা হয়।
এ ধরনের প্রতারণায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-মেইল, মোবাইল ফোন ও ভুয়া ওয়েবসাইটসহ বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কাশেমের ভাষ্য, প্রায় এক মাস ধরে ওই ভবনে বিদেশি নাগরিকদের চলাচল দেখা যাচ্ছিল। তাদের কেউ কেউ নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দিতেন। পরে সেখানে বড় অঙ্কের অর্থের লেনদেন ও ক্যাসিনোসদৃশ কর্মকাণ্ডের বিষয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তথ্য ছড়িয়ে পড়ে।
সিএমপির এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, বৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশের পরও কিছু বিদেশি নাগরিক বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। তাদের সঙ্গে স্থানীয় কিছু সহযোগীর যোগাযোগ রয়েছে, যারা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনে সহায়তা করে বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, কিছু বিদেশি বাংলাদেশে প্রবেশের পর নিজেদের পাসপোর্ট নষ্ট করে প্রকৃত পরিচয় গোপন করার চেষ্টা করেন এবং পরে বিভিন্ন এলাকায় বাসা বা হোটেল ভাড়া নিয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন।
অতিরিক্ত কমিশনার মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, ৬৩ জনকে অনলাইন প্রতারণায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ডিভাইসসহ গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ঘটনায় খুলশী থানায় মামলা হয়েছে। জব্দ করা ডিভাইসগুলো পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
