পাবনা প্রতিনিধি
উচ্চশিক্ষা শেষ করেও কাঙ্ক্ষিত চাকরি পাননি অনুজা সাহা এ্যানি। এর মধ্যে পারিবারিক আর্থিক সংকটও দেখা দেয়। তবে প্রতিকূলতার কাছে হার না মেনে নিজেই কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করেন তিনি। নিজের উদ্যোগের পাশাপাশি অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন এই নারী উদ্যোক্তা।
পাবনা শহরের গোপালপুর মহল্লার অমূল্য কুমার সাহা ও অঞ্জনা সাহার একমাত্র সন্তান অনুজা। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বাবা মেয়েকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। বাবার সেই স্বপ্ন পূরণে পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ থেকে অর্থনীতিতে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।
উচ্চশিক্ষা শেষ করে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির আবেদন ও পরীক্ষায় অংশ নিলেও সফল হননি অনুজা। এরই মধ্যে ২০০৭ সালে তার বিয়ে হয়। পরে স্বামীর ব্যবসায়িক অবস্থার অবনতি হলে পরিবারে আর্থিক সংকট দেখা দেয়। সংসারের দায়িত্বের পাশাপাশি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও চিন্তিত হয়ে পড়েন তিনি।
দীর্ঘদিন চাকরির চেষ্টা করেও সফল না হওয়ায় পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত নারী উদ্যোক্তাদের সফলতার গল্প তাকে অনুপ্রাণিত করে। এরপর চাকরির অপেক্ষায় না থেকে নিজেই কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন অনুজা। শুরুতে তার মা অঞ্জনা সাহা ব্যবসার বিষয়ে খুব আগ্রহী ছিলেন না। তবে মেয়ের পরিস্থিতি বুঝতে পেরে শেষ পর্যন্ত সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।
অঞ্জনা সাহা বিভিন্ন ধরনের খাবার রান্নায় দক্ষ ছিলেন। মায়ের এই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে অল্প পুঁজি নিয়ে ঘরে তৈরি খাবারের হোম ডেলিভারি ব্যবসা শুরু করেন অনুজা। প্রতিষ্ঠানের নাম দেন ‘অর্ণব অ্যান্ড কোং’। শুরুতে পিঠা, কেক, মিষ্টি, বেকারি পণ্য, ভাত, বিরিয়ানি ও বিভিন্ন ঘরোয়া খাবার সরবরাহ করা হতো। ধীরে ধীরে অর্ডার বাড়তে থাকে এবং পাবনা শহরের বাইর থেকেও বড় অর্ডার আসতে শুরু করে।
ব্যবসা বাড়ার সঙ্গে নিজের দক্ষতা উন্নয়নের দিকেও মনোযোগ দেন অনুজা। বিসিক, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর থেকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নেন তিনি। মায়ের কাছ থেকে সেলাই ও কাটিংয়ের কাজও শেখেন। পরে সেই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে বুটিক হাউসের ব্যবসা শুরু করেন।
ছোটবেলা থেকেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত অনুজা। মাত্র তিন বছর বয়সে নৃত্যচর্চা শুরু করেন। পরে সংগীতেও যুক্ত হন এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কার ও সনদ অর্জন করেন। ব্যবসার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক চর্চা অব্যাহত রেখে ‘মন ময়ূরী’ নামে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছেন তিনি।
‘মন ময়ূরী’তে শিশুদের আর্ট, নৃত্য, সংগীত, আবৃত্তি ও সুন্দর হাতের লেখা শেখানো হয়। ব্যবসার পাশাপাশি শিশুদের সৃজনশীল বিকাশে কাজ করেও আনন্দ পান অনুজা।
তার আরেকটি উদ্যোগ ‘মায়ের পরশ’ রেস্টুরেন্ট। পাবনা শহরের জেলা পাড়ায় ডিসি অফিসের কাছে গড়ে তোলা এই রেস্টুরেন্টে বাঙালি ঐতিহ্যবাহী খাবারের পাশাপাশি ভারতীয় ও আধুনিক খাবারও পরিবেশন করা হয়। স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী খাবারের ব্যবস্থা রাখার পাশাপাশি মধ্যবিত্ত ও সচ্ছল মানুষের জন্যও রয়েছে বিভিন্ন খাবারের আয়োজন। সাধ্যের মধ্যে ভালো খাবার দেওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন অনুজা।
অনুজা সাহার প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে নারী ও পুরুষ মিলিয়ে ১০ জন কাজ করছেন। পাশাপাশি অন্য প্রতিষ্ঠানেও কিছু নারী-পুরুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছেন তিনি।
তার প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ফয়সাল বলেন, অনুজার সঙ্গে কাজ করতে তার ভালো লাগে। তার মতে, অনুজা নিষ্ঠাবান ও পরিশ্রমী। তার কাজ কীভাবে ছোট উদ্যোগ থেকে বড় পর্যায়ে এগিয়ে যাওয়া যায়, সে বিষয়ে তাকে অনুপ্রাণিত করেছে।
অনুজা মনে করেন, পারিবারিক ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে এখনো অনেক নারী নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ করার সুযোগ পান না। সুযোগ পেলে নারীরা পরিবারকে সহযোগিতা করার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সরকারি প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ ও প্রয়োজনীয় আর্থিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, এতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি বর্তমান উদ্যোক্তারাও ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ পাবেন। অনেক নারীকে কর্মের সঙ্গে যুক্ত করাই তার নিজের স্বপ্ন।
অনুজা সাহা বলেন, ‘আমি শুধু নিজের জন্য এগিয়ে যেতে চাই না। আমার সঙ্গে যত বেশি মানুষকে কাজে যুক্ত করতে পারব, বিশেষ করে নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ করে দিতে পারব, ততই আমি আনন্দিত হব।’
সংগ্রাম ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে নিজের কর্মজীবনের পথ তৈরি করা অনুজা সাহা এ্যানির গল্প তাই শুধু একজন উদ্যোক্তার সাফল্যের গল্প নয়। এটি একজন শিক্ষিত নারীর নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা, পরিবারের পাশে থাকার দায়িত্ব এবং অন্যদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির একটি বাস্তব উদাহরণ।
পাবনা জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, পাবনার সব নারী উদ্যোক্তার পাশে জেলা প্রশাসন রয়েছে এবং তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সার্বিক সহায়তা দেওয়া হবে। অনুজা সাহা এ্যানির পাশেও জেলা প্রশাসন রয়েছে বলে জানান তিনি।
