ভিসা চালু ও নতুন হাইকমিশনার নিয়োগের মধ্যেও সীমান্তে বহিষ্কার বিতর্ক অব্যাহত
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই একদিকে পর্যটক ভিসা পুনরায় চালু করেছে ভারত, অন্যদিকে সীমান্তে কথিত ‘পুশ-ইন’ বা জোরপূর্বক লোক পাঠানোর অভিযোগ ঘিরে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, নয়াদিল্লি একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক লক্ষ্য ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক স্বার্থ সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে, যা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ধরনের দ্বৈত বার্তা তৈরি করছে।
গত ২৫ জুন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির কাছে পরিচয়পত্র পেশ করেন। একই দিনে তিনি দুই বছর বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য পর্যটক ভিসা পুনরায় চালুর ঘোষণা দেন। পাশাপাশি ভারতীয় প্রটোকল তালিকায় তাকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার মন্ত্রীর সমমর্যাদা দেওয়া হয়, যা ঢাকায় নিযুক্ত কোনো ভারতীয় কূটনীতিকের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন।
বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরের বেশি সময়ে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে লোক ঠেলে পাঠানোর একাধিক ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ রয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার পর এসব অভিযান আরও জোরদার হয়েছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই মানুষকে সীমান্ত পার করে দেওয়া হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার নীতির পরিপন্থী। অন্যদিকে ভারত দাবি করছে, তাদের অভ্যন্তরীণ আইন অনুযায়ী এসব পদক্ষেপ বৈধ।
সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকেও এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারতের বর্তমান নীতিকে শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্র স্পষ্ট হয় না। তাদের মতে, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—এই দুই স্তরে সমান্তরালভাবে নীতি পরিচালনা করছে নয়াদিল্লি।
ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ অনুপ্রবেশের প্রশ্নকে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে ‘সনাক্তকরণ, তালিকা থেকে বাদ দেওয়া ও বহিষ্কার’ ধরনের রাজনৈতিক স্লোগান নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার। তিস্তা চুক্তি, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতাসহ নানা কারণে ঢাকার সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যবেক্ষকদের মতে, দিনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগ কেবল একটি কূটনৈতিক পদায়ন নয়; এর মধ্যে রাজনৈতিক বার্তাও রয়েছে। সাবেক কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ত্রিবেদী বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পাবেন।
এ কারণে অনেকেই মনে করছেন, সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, বহিষ্কারের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছেন যাদের ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র ছিল। কিছু ক্ষেত্রে আদালত পরবর্তীতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নাগরিকত্ব নির্ধারণের প্রক্রিয়া যদি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে নিরীহ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত পরিস্থিতি, অভিবাসন ব্যবস্থাপনা এবং মানবাধিকার প্রশ্নে বাংলাদেশকে আরও সক্রিয় কূটনৈতিক অবস্থান নিতে হবে। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খোঁজা জরুরি।
ভারত একদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে সীমান্তে বহিষ্কার সংক্রান্ত বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে কূটনৈতিক সৌহার্দ্য ও রাজনৈতিক বাস্তবতা পরস্পরের সঙ্গে সমান্তরালভাবে চললেও তাদের মধ্যে বিদ্যমান বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
