মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে গভীর সমুদ্রসম্পদ আহরণে এফডিআই ও যৌথ বিনিয়োগে জোর
বাংলাদেশের সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতির বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) এবং যৌথ উদ্যোগভিত্তিক বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার। বিশেষ করে কক্সবাজারের মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে গভীর সমুদ্রের মৎস্যসম্পদ আহরণ, সামুদ্রিক কৃষি, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং রপ্তানিমুখী কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন সোমবার রাজধানীতে আয়োজিত এক সেমিনারে এ কথা জানান। ‘বাংলাদেশে মৎস্য ও সামুদ্রিক অর্থনীতিতে বিনিয়োগ সম্ভাবনা’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মহেশখালী ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (মিডা), সহযোগিতায় ছিল জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (JICA)।
বক্তারা জানান, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার বিস্তীর্ণ অংশে এখনও বাণিজ্যিকভাবে মৎস্য আহরণ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে ওঠেনি। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের গভীর সমুদ্র অঞ্চলের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, দেশীয় উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হলে গভীর সমুদ্রের সম্পদ আহরণে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। তিনি জানান, একটি জাপানি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ ও সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছে।
তার মতে, এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সামুদ্রিক পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, মাতারবাড়ীকে শুধু গভীর সমুদ্রবন্দর নয়, বরং একটি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এখানে জ্বালানি, সরবরাহব্যবস্থা, জলজ কৃষি, সামুদ্রিক মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ, মেরিকালচার এবং গভীর সমুদ্র মৎস্য আহরণভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
সাবেক সামুদ্রিক বিষয়ক সচিব ও অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. খুরশেদ আলম বলেন, মহেশখালী-মাতারবাড়ী অঞ্চলকে দীর্ঘমেয়াদে একটি সমন্বিত ব্যবসা ও শিল্পকেন্দ্রে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়েই পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সেমিনারে বাংলাদেশের সামুদ্রিক অর্থনীতিতে চারটি গুরুত্বপূর্ণ খাতকে সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়।
প্রথমত, গভীর সমুদ্রে টুনাসহ উচ্চমূল্যের বাণিজ্যিক মাছ আহরণের সুযোগ রয়েছে। এ জন্য আধুনিক লংলাইনার জাহাজ, গভীর সমুদ্রবন্দর এবং কার্যকর নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, উপকূলীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক শৈবাল, সামুদ্রিক মাছ ও ঝিনুক চাষের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে, যা ভবিষ্যতে আঞ্চলিক বাজারে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
তৃতীয়ত, দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত চিংড়ি শিল্পে বৈচিত্র্য আনা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সনদ নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে উচ্চমূল্যের বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ সহজ হয়।
চতুর্থত, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, কোল্ড চেইন ব্যবস্থা ও সংরক্ষণ প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াবে।
সেমিনারে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ১০টি লংলাইনার জাহাজের বহর গড়ে তুলতে প্রতিটি জাহাজে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। তবে এই খাতে প্রায় ৩৭ শতাংশ নিট মুনাফা এবং পাঁচ বছরের মধ্যে বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০৩৫ সালের মধ্যে ২৫ থেকে ৫০টি আধুনিক জাহাজ পরিচালনায় এলে সামুদ্রিক খাদ্যপণ্য রপ্তানি থেকে বছরে কয়েক মিলিয়ন ডলার আয় সম্ভব হবে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের দূতাবাসের মন্ত্রী তাকাহাশি নাওকি এবং জাইকার বাংলাদেশ প্রধান প্রতিনিধি তাকাহাশি জুনকো বলেন, বাংলাদেশের সামুদ্রিক অর্থনীতির বিকাশে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে জাপান সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।
তারা জানান, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে উপকূলীয় মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের উন্নয়ন এবং টেকসই সামুদ্রিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী নীল অর্থনীতি এখন প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশাল সমুদ্রসীমা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনও এ খাতের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারেনি। সরকার, বিদেশি বিনিয়োগকারী ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগ সফল হলে মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে সামুদ্রিক অর্থনীতি দেশের রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
