মস্কোর ২৫০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ আদেশ ঠেকাতে ব্রাসেলসের আদালতের দ্বারস্থ বেলজিয়ান আর্থিক প্রতিষ্ঠান
ইউরোপে স্থগিত থাকা রুশ রাষ্ট্রীয় সম্পদকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও পশ্চিমা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আইনি সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। বেলজিয়ামভিত্তিক আর্থিক পরিষেবা প্রতিষ্ঠান ইউরোক্লিয়ার (Euroclear) রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিরুদ্ধে বেলজিয়ামের একটি বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করেছে। মস্কোর একটি আদালত ইউরোক্লিয়ারকে ২৫০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি এই পদক্ষেপ নেয়।
বেলজিয়ান গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোক্লিয়ারের লক্ষ্য হলো রাশিয়ার আদালতের ওই রায় কার্যকর হওয়া ঠেকানো এবং আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর আওতায় নিজেদের অবস্থান সুরক্ষিত রাখা।
গত মাসে মস্কোর একটি সালিশি আদালত রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়ের করা প্রায় ১৮ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন রুবল (প্রায় ২৩১ বিলিয়ন ডলার) ক্ষতিপূরণ দাবিকে বহাল রাখে। পরে আদালত দ্রুত ওই রায় কার্যকরের অনুমতিও দেয়।
রাশিয়ার দাবি, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির সম্পদ আটকে রাখার ফলে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। তবে ইউরোক্লিয়ার শুরু থেকেই এই দাবিকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ জব্দ বা স্থগিত করে। এর মধ্যে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের সম্পদের বড় একটি অংশ ইউরোক্লিয়ারের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।
পরবর্তীতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এই স্থগিত সম্পদ থেকে অর্জিত আয় ইউক্রেনের পুনর্গঠন ও সহায়তা তহবিলে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়। এর পরপরই রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু করে।
মস্কোর আদালতের রায়ের পর ইউরোক্লিয়ার বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসের একটি বাণিজ্যিক আদালতে পাল্টা মামলা দায়ের করে। প্রতিষ্ঠানটির যুক্তি হলো, মস্কোয় পরিচালিত বিচারপ্রক্রিয়া ছিল স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের মৌলিক মানদণ্ডের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।
ইউরোক্লিয়ারের আইনজীবীরা দাবি করেছেন, ব্রাসেলসভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে চূড়ান্ত বিচারিক কর্তৃত্ব বেলজিয়ামের আদালতেরই থাকা উচিত। পাশাপাশি রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিরুদ্ধে চুক্তিভঙ্গের অভিযোগও তুলেছে প্রতিষ্ঠানটি।
গত সপ্তাহে ব্রাসেলসে মামলার প্রাথমিক শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিরোধ কেবল দুই পক্ষের আইনি লড়াই নয়; এটি বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা নীতি এবং সীমান্তপারের সম্পদ ব্যবস্থাপনার ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
যদি কোনো পক্ষের পক্ষে চূড়ান্ত রায় যায়, তবে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নতুন ঝুঁকি ও আইনি বাধ্যবাধকতার মুখোমুখি হতে পারে।
ইউরোক্লিয়ার বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সিকিউরিটিজ ক্লিয়ারিং ও সেটেলমেন্ট প্রতিষ্ঠান। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার আওতায় রাশিয়ার শত শত বিলিয়ন ইউরোর সম্পদ স্থগিত হওয়ার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
বর্তমান মামলাটি সেই বিরোধেরই সর্বশেষ অধ্যায়, যা ভবিষ্যতে ইউরোপ-রাশিয়া অর্থনৈতিক সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ইউরোক্লিয়ারের মধ্যকার এই আইনি লড়াই এখন ইউরোপীয় আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। স্থগিত রুশ সম্পদ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বৈশ্বিক আর্থিক শাসনব্যবস্থাকে ঘিরে চলমান এই বিরোধের ফলাফল আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে উঠতে পারে।
