১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বানের জবাবে বিএনপির অতীত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলল জামায়াত
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিএনপি মহাসচিবের পক্ষ থেকে জামায়াতকে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার বিরোধিতার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানানো হলে, তার জবাবে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পোরওয়ার দাবি করেছেন, স্বাধীনতার পর বিএনপি নিজেই এমন বহু ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নিয়োগ দিয়েছে, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিলেন।
মঙ্গলবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে বিএনপি সরকার অন্তত ১৪ থেকে ১৫ জন স্বাধীনতাবিরোধী ব্যক্তিকে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিয়েছে। ফলে এ বিষয়ে বিএনপিরও জবাবদিহি করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জামায়াতকে ১৯৭১ সালের অবস্থানের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান। এর প্রতিক্রিয়ায় পোরওয়ার বলেন, জামায়াত কোনো অপরাধ করেনি বলে তারা ক্ষমা চাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করে না।
তিনি বিএনপির উদ্দেশে বলেন, অতীত নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার আগে নিজেদের রাজনৈতিক ইতিহাসও পর্যালোচনা করা উচিত। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, মুক্তিযুদ্ধ-সম্পর্কিত বিতর্কিত বিষয়গুলো বারবার সামনে এনে রাজনৈতিক বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অভিযোগ করেন, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল প্রায়ই ১৯৭১ সালের প্রসঙ্গ নতুন করে উত্থাপন করে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের সময়কার রাজনৈতিক বাস্তবতা ও বিভিন্ন দলের অবস্থান সে সময়ের নেতারা জনগণের সামনে ব্যাখ্যা করেছিলেন। এ নিয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে, তবে বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হিসেবেই দেখা উচিত।
পোরওয়ার প্রশ্ন তোলেন, বিএনপি ও জামায়াত দীর্ঘদিন রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে একসঙ্গে কাজ করার সময় কেন স্বাধীনতা যুদ্ধের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়নি।
তিনি উল্লেখ করেন, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে চারদলীয়, ১৮ দলীয় এবং ২০ দলীয় জোটে দুই দল দুই দশকেরও বেশি সময় একসঙ্গে রাজনীতি করেছে। এমনকি বিভিন্ন নির্বাচন ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে উভয় দলের নেতারা যৌথভাবে অংশ নিয়েছেন বলেও তিনি স্মরণ করিয়ে দেন।
সংবাদ সম্মেলনে পোরওয়ার দাবি করেন, ১৯৯১ সালে বিএনপির সরকার গঠনে জামায়াত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তবে পরবর্তীতে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জামায়াতের ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের অভিযোগও তোলেন তিনি।
তার মতে, রাজনৈতিক প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে বিএনপি পুরোনো ইস্যু সামনে এনে জামায়াতকে আক্রমণ করার চেষ্টা করে।
সংবাদ সম্মেলনে কিছু গণমাধ্যমের ভূমিকাও সমালোচনা করেন জামায়াত নেতা। তার অভিযোগ, নির্দিষ্ট কিছু সংবাদমাধ্যম একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে অবস্থান নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করছে।
তিনি বলেন, গণমাধ্যম যদি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণায় জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য ইতিবাচক নয়।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদও। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে বিভাজনমূলক রাজনীতির কারণে দেশ কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও বিভেদের রাজনীতি অব্যাহত রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব নিয়ে আলোচনা চললেও, ১৯৭১ সালের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে শুরু হওয়া এই বাকযুদ্ধ দুই দলের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক মেরুকরণ যত বাড়বে, ততই অতীতের বিভিন্ন ইস্যু নতুন করে আলোচনায় আসতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
