শতাংশভিত্তিক ভ্যাটের পরিবর্তে ভরি ও গ্রামভিত্তিক কর; স্বর্ণে ২,৫০০ টাকা, রূপায় ১০০ টাকা এবং হীরায় ২,৫০০ টাকা ভ্যাট
দেশের গহনা খাতে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এনেছে সরকার। সংশোধিত অর্থ বিল ২০২৬ জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার মাধ্যমে স্বর্ণ, রূপা, প্লাটিনাম ও হীরার ওপর নির্দিষ্ট হারে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। নতুন কাঠামো অনুযায়ী প্রতি ভরি স্বর্ণ ও প্লাটিনামের ওপর ২ হাজার ৫০০ টাকা, প্রতি ভরি রূপার ওপর ১০০ টাকা এবং প্রতি গ্রাম হীরার ওপর ২ হাজার ৫০০ টাকা ভ্যাট দিতে হবে।
সোমবার কণ্ঠভোটে পাস হওয়া সংশোধিত অর্থ বিলে এই পরিবর্তন আনা হয়। এর ফলে এতদিন কার্যকর থাকা স্বর্ণ, রূপা ও হীরার ওপর সমান ৫ শতাংশ ভ্যাটের ব্যবস্থা বাতিল হয়ে গেল।
প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্বর্ণ ও রূপা—উভয়ের জন্য প্রতি ভরিতে ২ হাজার ৫০০ টাকা নির্দিষ্ট ভ্যাটের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)।
সংগঠনটির যুক্তি ছিল, স্বর্ণ ও রূপার বাজারমূল্যের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও একই হারে কর আরোপ যৌক্তিক নয়। তারা স্বর্ণের ক্ষেত্রে প্রতি ভরিতে ২ হাজার টাকা এবং হীরার ক্ষেত্রে প্রতি ক্যারেটে (০.২ গ্রাম) ২ হাজার টাকা ভ্যাট নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছিল।
বাজুসের মতে, গহনা খাতের বড় অংশ এখনও অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার আওতায় পরিচালিত হয়। ফলে শতাংশভিত্তিক ভ্যাট আদায় ও তদারকি তুলনামূলক কঠিন। নির্দিষ্ট অঙ্কের ভ্যাট চালু হলে কর ফাঁকির সুযোগ কমবে এবং রাজস্ব সংগ্রহ আরও সহজ হবে।
কর বিশেষজ্ঞদেরও একটি অংশ মনে করেন, নির্দিষ্ট ভ্যাট কাঠামো ব্যবসায়ী ও কর প্রশাসন উভয়ের জন্য হিসাব ব্যবস্থাকে সহজ করবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্বর্ণ ও রূপার পাশাপাশি হীরাকে নির্দিষ্ট ভ্যাট ব্যবস্থার আওতায় আনার ফলে গহনা খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
তার মতে, এতদিন হীরা বাণিজ্যের একটি বড় অংশ কার্যকর কর কাঠামোর বাইরে থাকায় রাজস্ব আহরণ সীমিত ছিল। নতুন ব্যবস্থায় সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সংশোধিত অর্থ বিলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। স্বর্ণ, গহনা এবং ডিজিটাল মুদ্রা বিক্রি করে অর্জিত মুনাফার ওপর প্রস্তাবিত ১৫ শতাংশ মূলধনী মুনাফা কর কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে এ করহার কমানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
গত এক বছরে দেশের বাজারে স্বর্ণের দামে উল্লেখযোগ্য উত্থান দেখা গেছে। ২০২৫ সালের ৫ জুন প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ছিল ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ২০২৬ সালের জুনে ২ লাখ ২৪ হাজার টাকায় পৌঁছায়।
এর আগে চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি স্বর্ণের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে প্রতি ভরি ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা স্পর্শ করেছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন ভ্যাট কাঠামো গহনা ব্যবসাকে আরও স্বচ্ছ ও কর ব্যবস্থার আওতায় আনতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে রাজস্ব বৃদ্ধি, কর ফাঁকি কমানো এবং বাজারে আনুষ্ঠানিক লেনদেন বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ মনে করছে, নতুন কর কাঠামোর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর কতটা পড়বে, তা নির্ভর করবে বাজারে স্বর্ণ ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামের গতিপ্রকৃতির ওপর।
গহনা খাতে দীর্ঘদিনের শতাংশভিত্তিক ভ্যাট ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে নির্দিষ্ট কর কাঠামো চালুর মাধ্যমে সরকার রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে। স্বর্ণ, রূপা ও হীরার ওপর নতুন ভ্যাট হার কার্যকর হলে বাজারে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
