ফুটবল ইতিহাসে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকা বলতেই সাধারণত আলোচনায় আসে পেলে, মিরোস্লাভ ক্লোজে, লিওনেল মেসি কিংবা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর নাম। কিন্তু দীর্ঘ সাত বছর ধরে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডটি যে একজন নারীর দখলে ছিল, সে তথ্য অনেকের কাছেই অজানা।
ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার মার্তা ভিয়েইরা দা সিলভা পাঁচটি বিশ্বকাপ আসরে মোট ১৭ গোল করে নারী-পুরুষ মিলিয়ে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার মর্যাদা অর্জন করেছিলেন। সম্প্রতি লিওনেল মেসি বিশ্বকাপে নিজের ১৮তম গোল করে সেই রেকর্ড ভেঙেছেন। কিন্তু রেকর্ডটি মার্তার দখলে থাকা সাত বছরে তাঁর অর্জন কখনোই বিশ্ব ফুটবলের মূল আলোচনায় যথাযথ গুরুত্ব পায়নি।
২০১৯ সালে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত FIFA Women’s World Cup 2019 থেকে ব্রাজিল বিদায় নেওয়ার পর আবেগঘন এক বক্তব্যে মার্তা নারী ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি নতুন প্রজন্মকে খেলাটির প্রতি আরও মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান এবং নারী ফুটবলে বিনিয়োগ ও সমর্থন বৃদ্ধির দাবি তোলেন। তাঁর সেই বক্তব্য কেবল একজন খেলোয়াড়ের আবেগ নয়, বরং দীর্ঘদিনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবেও বিবেচিত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী ফুটবলের জনপ্রিয়তা কম হওয়ার পেছনে স্বাভাবিক বাজার বাস্তবতার চেয়ে বেশি কাজ করেছে ঐতিহাসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধা। ১৯২০ সালে ইংল্যান্ডে নারী ফুটবল ম্যাচ দেখতে হাজারো দর্শক মাঠে উপস্থিত হলেও এক বছরের মধ্যেই The Football Association নারীদের ফুটবলকে তাদের অধিভুক্ত মাঠে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে চলা সেই নিষেধাজ্ঞা নারী ফুটবলের বিকাশকে ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত করে।
অর্থনৈতিক বৈষম্যও এই বাস্তবতার বড় উদাহরণ। ২০২৩ সালের নারী বিশ্বকাপ উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয় করলেও তা পুরুষদের বিশ্বকাপের তুলনায় অনেক কম ছিল। একইভাবে পুরস্কার অর্থ, সম্প্রচার চুক্তি এবং বাণিজ্যিক বিনিয়োগেও বড় ধরনের ব্যবধান রয়ে গেছে। সমালোচকদের মতে, নারী ফুটবলের প্রতি দীর্ঘদিনের সীমিত প্রচারই দর্শকসংখ্যা কম থাকার অন্যতম কারণ, যা পরবর্তীতে আবার কম বিনিয়োগের অজুহাত হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
তবে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। ২০২৩ নারী বিশ্বকাপের বিভিন্ন ম্যাচে রেকর্ডসংখ্যক দর্শক টেলিভিশন ও স্টেডিয়ামে উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ায় আয়োজক দলের সেমিফাইনাল ম্যাচ দেশটির টেলিভিশন ইতিহাসে অন্যতম সর্বাধিক দর্শকপ্রিয় ক্রীড়া সম্প্রচার হিসেবে স্থান করে নেয়। একই সময়ে বাণিজ্যিক অংশীদার ও স্পন্সর প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও বিষয়টি প্রাসঙ্গিক। Bangladesh Women’s National Football Team সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। বিশেষ করে সাবিনা খাতুন-এর নেতৃত্বে দলটি আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রশংসিত হয়েছে। তবে সাফল্যের তুলনায় নারী ফুটবল এখনও পর্যাপ্ত প্রচার, অবকাঠামোগত সুবিধা এবং আর্থিক সহায়তা পাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মেয়েদের খেলাধুলার অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করতে হলে কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প উদযাপন করলেই চলবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, উন্নত প্রশিক্ষণ সুবিধা, সমতাভিত্তিক বিনিয়োগ এবং গণমাধ্যমে যথাযথ উপস্থিতি নিশ্চিত করা।
নারী বিশ্বকাপের জনপ্রিয়তা ও দর্শকসংখ্যা বাড়লেও এখনও পুরুষ ও নারীদের মধ্যে পূর্ণ সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে নারী ফুটবলের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক সংস্থা, জাতীয় ফেডারেশন, সম্প্রচারমাধ্যম এবং নীতিনির্ধারকদের সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর।
মার্তার মতো কিংবদন্তিদের অবদান শুধু স্মরণ করাই যথেষ্ট নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, যেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নারী ফুটবলাররা সমান সুযোগ ও মর্যাদা নিয়ে নিজেদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পাবে।
