দেশি-বিদেশি বিরল ফলের সমাহারে দর্শনার্থী ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের আগ্রহের কেন্দ্র
মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার একটি টিলাভূমি এখন পরিণত হয়েছে দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির ফলগাছের সমৃদ্ধ সংগ্রহশালায়। ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই ব্যতিক্রমী বাগানের উদ্যোক্তা একজন বেসরকারি স্কুলশিক্ষক, যিনি পরীক্ষামূলকভাবে শতাধিক ফলের জাত চাষ করে স্থানীয় কৃষি মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন।
উপজেলার সারিয়া গ্রামের বাসিন্দা রেজাউল করিম খন্দকার ২০১৭ সালে অল্প কয়েকটি আমগাছ রোপণের মাধ্যমে তাঁর এই উদ্যোগ শুরু করেন। গাছগুলোতে সফলভাবে ফলন আসার পর ধীরে ধীরে তিনি বাগান সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেন।
প্রথমে আঙুর ও বিভিন্ন জাতের লেবুজাতীয় ফলের চাষ শুরু হলেও পরে দেশের বিভিন্ন নার্সারি এবং বিদেশি উৎস থেকে সংগ্রহ করা বিরল ফলগাছ যুক্ত হতে থাকে তাঁর বাগানে। প্রায় আড়াই লাখ টাকা ব্যক্তিগত বিনিয়োগে বর্তমানে দুই একর টিলাজুড়ে গড়ে উঠেছে এক ব্যতিক্রমী ফলবাগান।
বর্তমানে সেখানে প্রায় ১০০টি দেশি ও বিদেশি ফলের জাত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০ ধরনের আমের জাত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসবের মধ্যে রয়েছে আলফোনসো, আমেরিকান কেন্ট, হিমসাগর, থাই কাঁচামিঠা, নাম ডক মাই মুন ও আম্রপালিসহ নানা জনপ্রিয় ও বিরল জাত।
এ ছাড়া ১০ ধরনের কমলা ও মাল্টার চাষও করা হচ্ছে। কারা কারা, ওয়াশিংটন নেভেল, সাউথ আফ্রিকান হ্যালুম এবং সিলেটি কমলাসহ বিভিন্ন জাতের ফলগাছ সেখানে দেখা যায়।
বাগানে আরও রয়েছে ডালিম, পার্সিমন, আপেল, রাম্বুটান, ব্ল্যাকবেরি, জামরুল, তুর্কি তুঁত, কাজুবাদাম ও কুলের বিভিন্ন জাত। পাশাপাশি শখের বশে কালো টমেটো, চেরি টমেটো, লাল মূলা এবং বিভিন্ন জাতের মরিচও চাষ করছেন তিনি।
বাগানের দুটি বিদেশি ফল বিশেষভাবে দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। ইন্দোনেশিয়া থেকে সংগ্রহ করা ‘হানি কাপবোর্ড’ এবং ‘চুপাচোপা’ নামের এ দুটি ফল এখনও বাংলাদেশে খুব একটা পরিচিত নয়। হানি কাপবোর্ড দেখতে অনেকটা লিচুর মতো হলেও পাকলে এর ভেতরের অংশ জেলির মতো নরম হয়ে যায়। অন্যদিকে চুপাচোপা ফলটি অতিরিক্ত মিষ্টতার জন্য পরিচিত।
রেজাউল করিম প্রতিটি গাছের পরিচয় সংরক্ষণের জন্য নামফলক ব্যবহার করেছেন। ফলে বাগানে আসা দর্শনার্থীরা সহজেই প্রতিটি গাছ ও ফলের জাত সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন।
তিনি জানান, মূলত গবেষণাধর্মী আগ্রহ থেকেই এই উদ্যোগ। মৌলভীবাজারের মাটি ও আবহাওয়ায় কোন বিদেশি ফল কতটা সফলভাবে উৎপাদন করা সম্ভব, তা যাচাই করাই তাঁর লক্ষ্য। ফলন সন্তোষজনক হলে ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে চাষের বিষয়টি বিবেচনা করবেন।
এ বিষয়ে বড়লেখা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনোয়ার হোসেন বলেন, বিভিন্ন দেশি-বিদেশি ফলগাছ সংগ্রহ ও পরিচর্যায় রেজাউল করিমের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। কিছু জাত খুব ভালো ফলন দিচ্ছে, আবার কিছু জাত এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। তবে তাঁর এই প্রচেষ্টা স্থানীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।
বর্তমানে বাগানটি দেখতে নিয়মিত স্থানীয় মানুষ, শিক্ষার্থী ও কৃষিপ্রেমীরা ভিড় করছেন। তবে উদ্যোক্তার কাছে এটি এখনও ব্যবসার চেয়ে বেশি একটি শখ, যা গাছপালার প্রতি দীর্ঘদিনের ভালোবাসা থেকেই গড়ে উঠেছে।
