নিরাপদ প্রসবের ধারণা, চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও সামাজিক বাস্তবতা বাড়াচ্ছে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্মদানের হার
বাংলাদেশে সিজারিয়ান বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্মদানের হার গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ প্রবণতার পেছনে শুধু চিকিৎসাগত প্রয়োজন নয়, বরং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, চিকিৎসকদের পরামর্শ, পারিবারিক সিদ্ধান্ত, বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশে মোট প্রসবের প্রায় ৪৫ শতাংশ সিজারিয়ানের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে সংঘটিত প্রসবের ক্ষেত্রে এ হার প্রায় ৬৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে মাতৃত্বসেবা ক্রমেই বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতনির্ভর হয়ে উঠছে। ফলে অনেক পরিবার উন্নত সেবা, অভিজ্ঞ চিকিৎসক, নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং নির্ধারিত চিকিৎসা প্যাকেজকে নিরাপদ প্রসবের নিশ্চয়তা হিসেবে বিবেচনা করছে। এর ফলে সিজারিয়ান প্রসব অনেক ক্ষেত্রে জরুরি চিকিৎসা পদ্ধতির পরিবর্তে পূর্বপরিকল্পিত ও তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত একটি বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া অনেক মা সিজারিয়ানকে নিরাপদ পদ্ধতি হিসেবে উল্লেখ করলেও অস্ত্রোপচারের পর দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক কষ্ট, মানসিক চাপ এবং আর্থিক বোঝার কথাও তুলে ধরেছেন। তাঁদের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নিরাপত্তার আশ্বাস ও বাস্তব ভোগান্তির মধ্যে এক ধরনের দ্বৈততা বিদ্যমান।
গবেষণার ফলাফলে আরও দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রসবসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত শ্রমবেদনা শুরু হওয়ার অনেক আগেই নেওয়া হয়। জরিপে অংশগ্রহণকারী মায়েদের মধ্যে ৪৪ শতাংশ পরিকল্পিত সিজারিয়ান এবং ৫৬ শতাংশ জরুরি সিজারিয়ানের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দিয়েছেন। তবে প্রায় ৬০ শতাংশের ক্ষেত্রে প্রসবের অন্তত এক মাস আগে থেকেই সন্তান জন্মদানের পদ্ধতি নির্ধারিত ছিল।
চিকিৎসকদের প্রতি আস্থাও এ সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জরিপ অনুযায়ী, ৭১ শতাংশ নারী চিকিৎসকের পরামর্শে সিজারিয়ান করিয়েছেন। অন্যদিকে মাত্র ৬ শতাংশ নারী জানিয়েছেন যে, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তাঁরা নিজেরা নিয়েছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা, সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মানসিক চাপ থেকে পরিবারগুলো সিজারিয়ানকে তুলনামূলক নিরাপদ বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করে। ফলে ব্যক্তিগত পছন্দের চেয়ে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত হিসেবে বিষয়টি বেশি উপস্থাপিত হয়।
গবেষণায় চিকিৎসকদের একটি অংশ জানিয়েছেন, জটিলতা দেখা দিলে রোগীর স্বজনদের চাপ, বিরূপ প্রতিক্রিয়া কিংবা নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগও তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে কিছু ক্ষেত্রে সিজারিয়ানকে সম্ভাব্য ঝুঁকি ও দায় এড়ানোর একটি উপায় হিসেবেও দেখা হয়।
এদিকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত এখনও জনবল সংকটে ভুগছে। প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য চিকিৎসক, নার্স ও ধাত্রীর সংখ্যা আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অনেক কম। এর ফলে গর্ভবতী নারীদের নিয়মিত পরামর্শ, প্রসবকালীন পর্যবেক্ষণ এবং দীর্ঘসময় ধরে স্বাভাবিক প্রসব ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত সহায়তা দেওয়া সবসময় সম্ভব হয় না।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সিজারিয়ান প্রসবের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা বুঝতে হলে কেবল চিকিৎসাগত কারণ বিশ্লেষণ করলেই হবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
তাঁদের মতে, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সিজারিয়ান জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা পদ্ধতি হলেও অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার কমাতে প্রসূতি সেবার মানোন্নয়ন, স্বাস্থ্যকর্মী সংখ্যা বৃদ্ধি, স্বাভাবিক প্রসব বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো এবং চিকিৎসা সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
গবেষকদের ভাষ্য, নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্য অর্জনে সিজারিয়ান ও স্বাভাবিক প্রসব—উভয় ক্ষেত্রেই বৈজ্ঞানিক, মানবিক এবং রোগীকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে।
