প্রোস্টেট ক্যানসার শনাক্তকরণে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত পিএসএ (প্রোস্টেট-স্পেসিফিক অ্যান্টিজেন) রক্ত পরীক্ষার তুলনায় নতুন একটি ঝুঁকি মূল্যায়ন পদ্ধতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি কার্যকর হতে পারে বলে নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে। গবেষকরা বলছেন, ‘স্টকহোম৩’ নামের বহুমাত্রিক স্ক্রিনিং টুলটি ক্লিনিক্যালি গুরুত্বপূর্ণ প্রোস্টেট ক্যানসারের ৯০ শতাংশ শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে, যেখানে প্রচলিত পিএসএ পরীক্ষা শনাক্ত করেছে ৭৪ শতাংশ।
গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি চিকিৎসাবিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী অ্যানালস অব ইন্টারনাল মেডিসিন-এ প্রকাশিত হয়েছে। এতে দেখা যায়, নতুন পদ্ধতিটি ক্যানসার শনাক্তের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় ভুল-ইতিবাচক ফলের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়নি।
প্রোস্টেট ক্যানসার বিশ্বজুড়ে পুরুষদের মধ্যে অন্যতম সাধারণ ক্যানসার। রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার সফলতার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। তবে প্রচলিত পিএসএ পরীক্ষার সীমাবদ্ধতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। কারণ রক্তে পিএসএ-এর মাত্রা বেড়ে গেলেই যে ক্যানসার রয়েছে, এমন নয়। বয়স বৃদ্ধি, প্রোস্টেট গ্রন্থি বড় হয়ে যাওয়া বা প্রদাহের কারণেও পিএসএ বাড়তে পারে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় এমআরআই, বায়োপসি এবং মানসিক উদ্বেগের সৃষ্টি হয়।
অন্যদিকে কিছু আক্রমণাত্মক বা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম প্রোস্টেট ক্যানসার পিএসএ পরীক্ষায় ধরা না-ও পড়তে পারে। এ কারণে গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরে আরও নির্ভুল স্ক্রিনিং পদ্ধতি খুঁজে আসছিলেন।
স্টকহোম৩ পরীক্ষায় শুধু পিএসএ-এর মাত্রা নয়, বরং জিনগত ঝুঁকি, রক্তের বিভিন্ন প্রোটিন এবং রোগীর বয়স, পারিবারিক ইতিহাসসহ বিভিন্ন ক্লিনিক্যাল তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করা হয়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে একজন ব্যক্তির প্রোস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকি নির্ধারণ করা হয়।
সুইডেনের কারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা ৫০ থেকে ৭৪ বছর বয়সী ১২ হাজার ৬০০-এর বেশি পুরুষের তথ্য বিশ্লেষণ করেন। অংশগ্রহণকারীদের পিএসএ পরীক্ষা এবং স্টকহোম৩ মূল্যায়ন উভয়ই করা হয়। যাদের ফলাফলে ঝুঁকি পাওয়া যায়, তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী এমআরআই ও বায়োপসির জন্য পাঠানো হয়। এরপর দুই বছর ধরে ক্যানসার শনাক্তের তথ্য পর্যবেক্ষণ করা হয়।
গবেষণার প্রধান লেখক থোরগেরদুর পালসদত্তির বলেন, স্টকহোম৩ ক্লিনিক্যালি গুরুত্বপূর্ণ প্রোস্টেট ক্যানসার শনাক্তে পিএসএ পরীক্ষার তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। দুই বছরের অনুসরণকাল শেষে দেখা যায়, ৪৪৩টি গুরুত্বপূর্ণ ক্যানসার কেসের মধ্যে স্টকহোম৩ শনাক্ত করেছে ৪০০টি, যেখানে পিএসএ পরীক্ষায় শনাক্ত হয়েছে ৩২৭টি।
তার ভাষায়, একই সংখ্যক রোগীকে পরবর্তী পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েও স্টকহোম৩ মাত্র ১০ শতাংশ গুরুত্বপূর্ণ ক্যানসার শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে, যেখানে পিএসএ পরীক্ষার ক্ষেত্রে এই হার ২৬ শতাংশ।
গবেষণায় যুক্ত বিশেষজ্ঞরা আরও উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রে বহুল ব্যবহৃত পিএসএ-এর ৪ ন্যানোগ্রাম/মিলিলিটার সীমা ব্যবহার করলে মাত্র ৫২ শতাংশ গুরুত্বপূর্ণ ক্যানসার শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক ক্যানসার প্রাথমিক স্ক্রিনিংয়ে ধরা পড়েনি।
গবেষণায় দেখা গেছে, স্টকহোম৩ ব্যবহারের ফলে অপ্রয়োজনীয় বায়োপসির সংখ্যাও কমানো সম্ভব হতে পারে। গবেষকদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে স্টকহোম৩ ব্যবহার করে ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের চিহ্নিত করা হলে তাদের এমআরআই করানো যেতে পারে। এরপর প্রয়োজন হলে বায়োপসির সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। এতে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, জটিলতা এবং কম ঝুঁকির ক্যানসার অতিরিক্ত শনাক্ত হওয়ার প্রবণতা কমতে পারে।
থোরগেরদুর পালসদত্তির জানান, পিএসএ-এর মাত্রা কম হলেও অনেকের মধ্যে আক্রমণাত্মক ক্যানসার থাকতে পারে। স্টকহোম৩ অতিরিক্ত জৈবিক ও ক্লিনিক্যাল তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন রোগীদের শনাক্ত করতে সক্ষম হওয়ায় এটি আরও কার্যকর ফল দিচ্ছে।
গবেষণাটি আরও ইঙ্গিত দিয়েছে যে বিভিন্ন জাতিগত ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মধ্যেও স্টকহোম৩ একই ধরনের নির্ভুলতা দেখিয়েছে। উত্তর আমেরিকার বহুজাতিক জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত পৃথক মূল্যায়নেও পরীক্ষাটির কার্যকারিতা ও নির্ভরযোগ্যতা বজায় ছিল।
তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, জাতীয় পর্যায়ের স্ক্রিনিং কর্মসূচিতে এটি অন্তর্ভুক্ত করার আগে আরও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন। বিশেষ করে উন্নত পর্যায়ের ক্যানসার এবং প্রোস্টেট ক্যানসারজনিত মৃত্যুহার কমাতে এই পদ্ধতি বাস্তবে কতটা ভূমিকা রাখতে পারে, তা যাচাই করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে জিনগত, জৈব রাসায়নিক ও ক্লিনিক্যাল তথ্য সমন্বিত ঝুঁকিভিত্তিক স্ক্রিনিং পদ্ধতি প্রোস্টেট ক্যানসার শনাক্তকরণে নতুন মানদণ্ড তৈরি করতে পারে। এর মাধ্যমে রোগীরা আরও নির্ভুল ঝুঁকি মূল্যায়ন পাবেন এবং চিকিৎসকেরাও এমআরআই বা বায়োপসির মতো পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে অধিক তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
