সুদানের পশ্চিম কর্দোফান অঙ্গরাজ্যে নতুন করে কলেরা প্রাদুর্ভাব ঘোষণার কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটি জানিয়েছে, চলতি প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত অন্তত ১২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে মে মাস থেকে দেশটির বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় আরও ১ হাজার ১০২টি সন্দেহভাজন সংক্রমণের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে।
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, সুদানে টানা তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) সংঘাত দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছে। ফলে সংক্রামক রোগ মোকাবিলার সক্ষমতা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
পশ্চিম কর্দোফান বর্তমানে সুদানের সেনাবাহিনী ও আরএসএফ নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ সংঘাতপূর্ণ এলাকা। স্বাস্থ্যসেবা ও মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এ অঞ্চলটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এটি গত তিন বছরে সুদানে তৃতীয় কলেরা প্রাদুর্ভাব। সর্বশেষ প্রাদুর্ভাব গত মার্চে শেষ হয়েছে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তবে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে আবারও নতুন সংক্রমণ দেখা দেওয়ায় উদ্বেগ বেড়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত চলা আগের প্রাদুর্ভাবে ১ লাখ ২৪ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ আক্রান্ত হন এবং প্রায় ৩ হাজার ৫০০ জনের মৃত্যু হয়।
ডব্লিউএইচও বলছে, সুদানে কলেরা দীর্ঘদিন ধরেই একটি স্থানীয় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। তবে চলমান সংঘাত, দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রবেশে বাধা এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে দেশটি এখন প্রায় ধারাবাহিকভাবে প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি হচ্ছে।
সংঘাতের কারণে লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ায় তাদের জন্য বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আগামী কয়েক সপ্তাহে বর্ষা মৌসুম শুরু হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। কারণ বৃষ্টিপাতের সময় বিশুদ্ধ পানির সংকট ও স্বাস্থ্যসেবা বিঘ্নিত হওয়ার কারণে সাধারণত কলেরা সংক্রমণ দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
ডব্লিউএইচও আরও জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় অর্থায়নের অভাবে তাদের কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। চলতি বছরে সংস্থাটি যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন ছিল, তার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ সংগ্রহ করতে পেরেছে।
এদিকে পার্শ্ববর্তী উত্তর কর্দোফান অঙ্গরাজ্যেও প্রায় ৩০০টি সন্দেহভাজন কলেরা সংক্রমণ এবং তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এতে নতুন প্রাদুর্ভাব আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জাতিসংঘ সতর্ক করে জানিয়েছে, আরএসএফ পশ্চিম কর্দোফানের রাজধানী এল-ওবেইদের ওপর বড় ধরনের স্থল হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে সংঘাত ও জনস্বাস্থ্য সংকট একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে দেশটিকে।
মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, তিন বছরের এই যুদ্ধে সুদানে দুই লাখেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়ে থাকতে পারেন। একই সময়ে দেশের প্রায় সব হাসপাতাল সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে অকার্যকর হয়ে পড়েছে, যা কলেরাসহ অন্যান্য সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠিন করে তুলছে।
যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, স্বাস্থ্যসেবার ভঙ্গুর অবস্থা এবং অর্থায়নের সংকট—সব মিলিয়ে সুদান বর্তমানে এক জটিল মানবিক ও স্বাস্থ্য সংকটের মুখোমুখি, যা আন্তর্জাতিক সহায়তা ছাড়া সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে।
