বিশ্বকাপ ২০২৬-এর নকআউট পর্বে উত্তেজনা, শারীরিক লড়াই এবং নাটকীয়তায় ভরা এক ম্যাচে প্যারাগুয়েকে ১-০ গোলে পরাজিত করে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে ফ্রান্স। ফিলাডেলফিয়ায় অনুষ্ঠিত শেষ ষোলোর এই লড়াইয়ে জয়সূচক গোলটি করেন অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে, যিনি দ্বিতীয়ার্ধে পাওয়া একটি পেনাল্টিকে গোলে রূপান্তর করেন।
ম্যাচজুড়ে বলের নিয়ন্ত্রণ ও আক্রমণে এগিয়ে থাকলেও সুসংগঠিত প্যারাগুয়ে রক্ষণভাগের কারণে গোলের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে ফরাসিদের। তবে শেষ পর্যন্ত এমবাপ্পের নির্ভুল ফিনিশিংই গড়ে দেয় ম্যাচের পার্থক্য।
খেলার শুরু থেকেই প্যারাগুয়ে রক্ষণভাগকে শক্তিশালী রেখে খেলতে থাকে। প্রথম ১০ মিনিটে বলের নিয়ন্ত্রণ প্রায় পুরোপুরি ফ্রান্সের কাছে থাকলেও এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে ও মাইকেল ওলিসের নেতৃত্বে গড়া আক্রমণগুলো বারবার প্রতিহত হয়।
প্রথমার্ধে দুই দলই লক্ষ্যে কোনো শট নিতে পারেনি। বিশ্বকাপের নকআউট ইতিহাসে বিরল এই পরিসংখ্যান ম্যাচটির আক্রমণভাগের সীমাবদ্ধতাই তুলে ধরে।
তবে গোলের অভাব থাকলেও উত্তেজনার ঘাটতি ছিল না। ৩৫তম মিনিটে আন্দ্রেস কুবাসের কঠোর ট্যাকলে এমবাপ্পে পড়ে গেলে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি ও উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় শুরু হয়। রেফারির দ্রুত হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
বিরতির পর আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে ফ্রান্স। ৫২তম মিনিটে গোলরক্ষক মাইক মাইনিয়ঁর দীর্ঘ পাস ধরে একক প্রচেষ্টায় এগিয়ে গিয়েছিলেন এমবাপ্পে। তবে শেষ মুহূর্তে হুয়ান কাসেরেসের চমৎকার ট্যাকলে রক্ষা পায় প্যারাগুয়ে।
পরবর্তী কয়েক মিনিটে দেম্বেলে ও কোনের শটও গোলের দেখা পায়নি। প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক অরলান্দো গিল একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে ম্যাচে দলকে টিকিয়ে রাখেন।
ম্যাচের ৬৯তম মিনিটে বদলি খেলোয়াড় দেজিরে দুয়ে বক্সের ভেতরে ঢোকার সময় দিয়েগো গোমেজের ফাউলের শিকার হন। প্রথমে খেলা চালিয়ে দিলেও পরে ভিএআরের পরামর্শে ঘটনাটি পুনরায় দেখে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন রেফারি।
৭০তম মিনিটে স্পটকিক নিতে এসে কোনো ভুল করেননি এমবাপ্পে। নিচু শটে গোলরক্ষককে পরাস্ত করে ফ্রান্সকে এগিয়ে দেন তিনি।
এই গোলের মাধ্যমে চলতি বিশ্বকাপে এমবাপ্পের গোলসংখ্যা দাঁড়ায় সাতটিতে। একই সঙ্গে বিশ্বকাপ ইতিহাসে তাঁর মোট গোল হয় ১৯টি। ফলে গোলসংখ্যার হিসেবে তিনি এখন লিওনেল মেসির ঠিক পেছনে অবস্থান করছেন।
গোল হজমের পর প্যারাগুয়ে আক্রমণে কিছুটা সক্রিয় হলেও ফরাসি রক্ষণকে বড় কোনো বিপদে ফেলতে পারেনি। বরং যোগ করা সময়ে ব্যবধান বাড়ানোর সুবর্ণ সুযোগ পান এমবাপ্পে। কিন্তু গোলরক্ষক গিলের দুর্দান্ত জোড়া সেভে দ্বিতীয় গোল থেকে বঞ্চিত হয় ফ্রান্স।
ম্যাচের শেষভাগে উত্তেজনা আরও বাড়ে। একাধিক কঠিন ট্যাকল ও পাল্টা প্রতিক্রিয়ার কারণে খেলোয়াড়দের মধ্যে বারবার উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এমনকি ম্যাচ শেষের পরও দুই দলের ফুটবলারদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কোচ দিদিয়ের দেশমকেও কয়েকবার হস্তক্ষেপ করতে হয়।
এই জয়ের ফলে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে ফ্রান্স। শেষ আটে তাদের প্রতিপক্ষ মরক্কো, যারা নিজেদের ম্যাচে কানাডাকে বিদায় করে পরবর্তী পর্ব নিশ্চিত করেছে।
ফ্রান্সের লক্ষ্য এখন আরও একধাপ এগিয়ে শিরোপার পথে অগ্রসর হওয়া। অন্যদিকে, দৃঢ় রক্ষণ ও লড়াকু মানসিকতা দেখিয়েও শেষ পর্যন্ত বিদায় নিতে হলো প্যারাগুয়েকে।
নান্দনিক ফুটবলের চেয়ে লড়াই, শারীরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং মানসিক দৃঢ়তার প্রদর্শনী হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে ফ্রান্স-প্যারাগুয়ে ম্যাচটি। এমবাপ্পের পেনাল্টি গোল ফ্রান্সকে জয় এনে দিলেও ম্যাচজুড়ে দুই দলের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিশ্বকাপের নকআউট নাটকীয়তাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
