gপরিকল্পনা ও সমীক্ষার ঘাটতিতে ব্যাহত অগ্রগতি, বাড়ছে সময় ও ব্যয়ের চাপ
চট্টগ্রাম নগরের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানে নেওয়া অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ের বহু গুণ বেশি দীর্ঘায়িত হতে যাচ্ছে। মাত্র তিন বছরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল এখন ১১ বছরে পৌঁছানোর পথে। পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় পর্যাপ্ত সমীক্ষার অভাব, মাঠপর্যায়ে উদ্ভূত জটিলতা এবং অর্থায়নসংক্রান্ত পরিবর্তনের কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) অধীনে বাস্তবায়নাধীন ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। নতুন সময়সীমা অনুযায়ী প্রকল্পটি শেষ হওয়ার সম্ভাব্য সময় ২০২৮ সালের জুন।
সংশ্লিষ্ট নথি ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রকল্প অনুমোদনের আগে নগরের জলপ্রবাহ, খাল-নালা ব্যবস্থাপনা, জোয়ার-ভাটা এবং ড্রেনেজ কাঠামোর ওপর প্রয়োজনীয় বিস্তৃত সমীক্ষা করা হয়নি। ফলে বাস্তবায়নের শুরুতেই নানা জটিলতা সামনে আসে।
এর প্রভাব এতটাই ছিল যে প্রকল্প অনুমোদনের পর প্রায় দেড় থেকে দুই বছর পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য ভৌত কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে কাজ এগোতে গিয়ে নতুন নতুন সমস্যা শনাক্ত হওয়ায় প্রকল্পের সময়সীমা বারবার বাড়াতে হয়েছে।
দ্বিতীয় দফা সংশোধিত প্রস্তাবে প্রকল্প ব্যয় কিছুটা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কয়েকটি অবকাঠামোগত উপাদান যেমন সিল্ট ট্র্যাপ, ফুটপাত, নালা সম্প্রসারণ এবং কিছু সড়ক উন্নয়নকাজের পরিধি সীমিত করা হয়েছে।
ফলে প্রকল্পের মোট ব্যয় কিছুটা হ্রাস পেলেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ ও উন্নয়ন খাতে ব্যয় বেড়েছে। বিশেষ করে খাল খনন ও গভীরতা বৃদ্ধি, ড্রেনেজ অবকাঠামো সংরক্ষণ, আরসিসি সড়ক, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণে অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন হচ্ছে।
বর্তমানে সংশোধিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা।
প্রকল্পের অর্থায়ন কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে একটি অংশ সিডিএর নিজস্ব তহবিল এবং সরকারি ঋণের মাধ্যমে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ছিল। তবে নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী প্রকল্পের প্রায় পুরো অর্থই সরকারি অনুদান হিসেবে পাওয়া যাবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকার ধাপে ধাপে অর্থ ছাড় করবে। ফলে অর্থপ্রবাহের সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা নিরসনে গত এক দশকে একাধিক বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এসব প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও বর্ষা মৌসুমে নগরের বিভিন্ন এলাকায় এখনো জলাবদ্ধতা নিয়মিত দৃশ্য।
বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারী বৃষ্টিপাতের সময় প্রধান সড়ক, আবাসিক এলাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলো পানিতে তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা নগরবাসীর ভোগান্তি বাড়িয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, পরিবহন ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
নগর পরিকল্পনা ও প্রকৌশল বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাবদ্ধতার মতো জটিল সমস্যা সমাধানে সমন্বিত পরিকল্পনা ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ অপরিহার্য। কিন্তু প্রকল্পটির ক্ষেত্রে সেই প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল স্পষ্ট।
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (আইইবি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, পর্যাপ্ত সমীক্ষা ছাড়া প্রকল্প গ্রহণ করায় শুরু থেকেই বাস্তবায়নে সমস্যা দেখা দেয়। মাঠপর্যায়ে কাজের সময় নতুন চ্যালেঞ্জ সামনে আসতে থাকায় প্রকল্পের সময় বাড়ানো ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না।
সিডিএ সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খালের উন্নয়নকাজ এখনো শেষ হয়নি। এসব কাজ সম্পন্ন করে পুরো প্রকল্প কার্যকর করতে অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন হবে।
চট্টগ্রামের দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানে নেওয়া বৃহৎ প্রকল্পটি নগরবাসীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও পরিকল্পনার ঘাটতি, বাস্তবায়ন জটিলতা এবং অর্থায়ন কাঠামোর পরিবর্তনের কারণে তা নির্ধারিত সময়ের অনেক বাইরে চলে গেছে। প্রকল্পটি শেষ হলে নগরের ড্রেনেজ ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসার প্রত্যাশা থাকলেও কার্যকর ফল পেতে সমন্বিত নগর পরিকল্পনা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করার বিকল্প নেই।
