পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর মন্তব্য: দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতা জোরদারে নতুন উদ্যোগের ইঙ্গিত
দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রধান প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা আঞ্চলিক সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম সার্কের কার্যকারিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তাঁর মতে, এই বিরোধের প্রভাব শুধু দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং সার্কভুক্ত অন্যান্য দেশগুলোর মধ্যেও রাজনৈতিক আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, যা সংগঠনটির কার্যক্রমকে দীর্ঘ সময় ধরে স্থবির করে রেখেছে।
সোমবার (৬ জুলাই) রাজধানীর ইস্কাটনে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) আয়োজিত ‘সার্কের ভবিষ্যৎ ও আঞ্চলিক সহযোগিতা’ বিষয়ক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে পৃথকভাবে যোগাযোগ ও আলোচনা করা হয়েছে। এসব আলোচনায় সদস্য দেশগুলো সার্ককে আরও কার্যকর ও সক্রিয় করার বিষয়ে ইতিবাচক আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
তিনি বলেন, আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য সার্ক এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও দ্বিপক্ষীয় বিরোধের কারণে সংগঠনটির কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হলেও সদস্য রাষ্ট্রগুলো নতুন করে সহযোগিতার পথ খুঁজছে।
সেমিনারে শামা ওবায়েদ ইসলাম আরও বলেন, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার দুই গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন সার্ক এবং বিমসটেককে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং উভয় প্ল্যাটফর্ম পরস্পরকে সহায়তা করে আঞ্চলিক উন্নয়ন ও সংযোগ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তার মতে, বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি সহযোগিতা এবং নিরাপত্তা সংলাপের মতো ক্ষেত্রগুলোতে সমন্বিত উদ্যোগ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশ নিয়ে গঠিত সার্ক একসময় আঞ্চলিক সহযোগিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন হিসেবে বিবেচিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের অবনতির কারণে একাধিক শীর্ষ সম্মেলন অনিশ্চয়তায় পড়ে এবং সংগঠনটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াও ধীর হয়ে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের এই সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ সদস্য দেশগুলোর জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সার্ক কার্যকরভাবে সক্রিয় হলে আন্তঃদেশীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি, যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং শিক্ষা-সংস্কৃতি বিনিময়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সদস্য দেশগুলো উপকৃত হতে পারে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সংলাপের সুযোগ বাড়লে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাও শক্তিশালী হবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো আঞ্চলিক সহযোগিতার গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করছে। ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার কারণে সৃষ্ট আস্থার সংকট কাটিয়ে সার্ককে পুনরায় সক্রিয় করা গেলে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সহযোগিতার নতুন অধ্যায় সূচিত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।
