বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা আবারও প্রমাণ করল কেন তারা বড় মঞ্চের দল। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর (রাউন্ড অব ১৬) ম্যাচে শুরুতে পিছিয়ে পড়া, লিওনেল মেসির পেনাল্টি মিস এবং কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও অসাধারণ প্রত্যাবর্তন করে মিশরকে ৩-২ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করেছে আলবিসেলেস্তেরা।
আটলান্টা স্টেডিয়ামে ৬৮ হাজার ২৩৯ দর্শকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ম্যাচটি ছিল এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম নাটকীয় লড়াই। ম্যাচের শুরুতে সবাই যেখানে আর্জেন্টিনার সহজ জয়ের অপেক্ষায় ছিল, সেখানে দুর্দান্ত কাউন্টার অ্যাটাক এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণভাগ দিয়ে মিশর ম্যাচটিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ দেয়।
শুরুতেই চমক দেখায় মিশর
ম্যাচের ১৫তম মিনিটেই প্রথম বড় ধাক্কা খায় আর্জেন্টিনা। একটি কর্নার থেকে ইয়াসের ইব্রাহিমের শক্তিশালী হেড আর্জেন্টিনার জালে জড়িয়ে গেলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় মিশর। গোলটি পুরো স্টেডিয়ামকে স্তব্ধ করে দেয়, কারণ ম্যাচের আগে অধিকাংশ ফুটবল বিশ্লেষক আর্জেন্টিনাকেই পরিষ্কার ফেবারিট হিসেবে দেখেছিলেন।গোল হজমের পর বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিলেও আর্জেন্টিনা প্রথমার্ধে মিশরের সংগঠিত রক্ষণভাগ ভাঙতে হিমশিম খায়।
পেনাল্টি পেলেও ব্যর্থ মেসি
গোল শোধের সুবর্ণ সুযোগ আসে কিছুক্ষণ পর। আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার নিকোলাস তাগলিয়াফিকোকে পেনাল্টি বক্সের ভেতরে ফাউল করলে রেফারি স্পট-কিকের নির্দেশ দেন।স্বাভাবিকভাবেই পেনাল্টি নিতে এগিয়ে আসেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। তবে এবারের বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ছন্দে থাকা এই তারকা হতাশ করেন সমর্থকদের। তার নেওয়া শট অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন মিশরের গোলরক্ষক মোস্তাফা আহমেদ শোবেইর। এটি ছিল ২০২৬ বিশ্বকাপে মেসির দ্বিতীয় পেনাল্টি মিস।এই সেভের পর মিশরের খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে যায় এবং তারা দ্রুত পাল্টা আক্রমণে আর্জেন্টিনাকে চাপে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যায়।
দ্বিতীয়ার্ধে বদলে যায় ম্যাচের চিত্র
বিরতির পর একেবারে ভিন্ন রূপে মাঠে নামে আর্জেন্টিনা। আক্রমণের গতি বাড়িয়ে একের পর এক সুযোগ তৈরি করতে থাকে তারা। অবশেষে ধারাবাহিক চাপের ফল আসে। একের পর এক তিনটি গোল করে ম্যাচে ৩-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
মিশর অবশ্য শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যায়। ম্যাচের শেষদিকে তারা আরেকটি গোল করে ব্যবধান ৩-২ করলেও সমতায় ফিরতে পারেনি। নির্ধারিত সময় শেষে আর্জেন্টিনাই ৩-২ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে শেষ আটের টিকিট কেটে নেয়।
পরিসংখ্যানে আর্জেন্টিনার আধিপত্য
স্কোরলাইন যতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল, ম্যাচের পরিসংখ্যান ততটাই আর্জেন্টিনার আধিপত্যের গল্প বলে।
- বল দখল: আর্জেন্টিনা ৫৮%, মিশর ৪২%
- গোলের চেষ্টা: আর্জেন্টিনা ১৪টি, মিশর ৪টি
- লক্ষ্যে শট: আর্জেন্টিনা ৭টি, মিশর ২টি
- লক্ষ্যের বাইরে শট: উভয় দল ২টি করে
- কর্নার: আর্জেন্টিনা ৬টি, মিশর ১টি
- অফসাইড: আর্জেন্টিনা ৩টি, মিশর ০টি
- ফাউল: আর্জেন্টিনা ১৩টি, মিশর ১০টি
মিশরের গোলরক্ষক মোস্তাফা শোবেইর চারটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে দলকে দীর্ঘ সময় ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার গোলরক্ষককে কোনো সেভ করতে হয়নি, যা আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের দৃঢ়তারই প্রমাণ।
কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা
এই জয়ের ফলে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখল আর্জেন্টিনা। শেষ আটে তাদের প্রতিপক্ষ হবে সুইজারল্যান্ড অথবা কলম্বিয়ার মধ্যকার ম্যাচের বিজয়ী দল।লিওনেল মেসির পেনাল্টি মিস ম্যাচটিকে আরও কঠিন করে তুললেও শেষ পর্যন্ত দলগত পারফরম্যান্স, অভিজ্ঞতা এবং দ্বিতীয়ার্ধের আক্রমণাত্মক ফুটবলই আর্জেন্টিনাকে জয় এনে দেয়। অন্যদিকে মিশর পরাজিত হলেও তাদের সাহসী পারফরম্যান্স, দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক এবং সংগঠিত ডিফেন্স বিশ্ব ফুটবলপ্রেমীদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এই নাটকীয় জয় আর্জেন্টিনার আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন তাদের লক্ষ্য কোয়ার্টার ফাইনালের বাধা পেরিয়ে শিরোপা ধরে রাখার লড়াই আরও এক ধাপ এগিয়ে নেওয়া।
