তেল ও ডলারের দাম বাড়লেও কমেছে স্বর্ণের মূল্য, বাড়ছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক পণ্যবাজারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সংকটের প্রভাবে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও মার্কিন ডলারের দাম বাড়লেও নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত স্বর্ণের বাজারে দেখা গেছে নিম্নমুখী প্রবণতা। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) এশীয় বাজারে স্পট গোল্ডের দাম আগের দিনের তুলনায় ০.৩ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৬৬ ডলারের কিছু বেশি পর্যায়ে নেমে আসে। এর আগে বুধবার স্বর্ণের দাম চলতি মাসের সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছেছিল।
স্পট মার্কেটের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের স্বর্ণ ফিউচার বাজারেও মূল্যহ্রাসের প্রবণতা দেখা গেছে। আগস্ট মাসের ডেলিভারির জন্য স্বর্ণের ফিউচার চুক্তির দাম সামান্য কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৭৭ ডলারে লেনদেন হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে বিনিয়োগকারীরা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, সুদের হার এবং ডলারের গতিপ্রকৃতির দিকে গভীর নজর রাখছেন। এসব বিষয় স্বর্ণের বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
ইরানকে ঘিরে নতুন সামরিক তৎপরতার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ বেড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম টানা ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। আগের দিনের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির পরও বৃহস্পতিবার তেলের দামে আরও ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে।
ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত ডলারভিত্তিক সম্পদের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ফলে মার্কিন ডলারের মানও শক্তিশালী হয়েছে। ডলারের মূল্য বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণ তুলনামূলক ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে, যা অনেক ক্ষেত্রে স্বর্ণের চাহিদা কমিয়ে দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এ কারণেও সাম্প্রতিক সময়ে স্বর্ণের বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের ধারণা, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানির মূল্য আরও বাড়তে পারে। এতে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়বে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখতে হতে পারে।
বিশেষ করে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ দীর্ঘ সময় উচ্চ সুদের হার ধরে রাখতে পারে বলে বাজারে আলোচনা চলছে। প্রয়োজন হলে সুদের হার আরও বাড়ানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৬ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্থর প্রবৃদ্ধি এবং দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার কারণে এই সংশোধিত পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যাংক অব আমেরিকা আগামী বছরের গড় স্বর্ণমূল্যের পূর্বাভাসও কমিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি মনে করছে, কঠোর মুদ্রানীতির কারণে স্বর্ণের বাজারে প্রত্যাশিত ঊর্ধ্বগতি সীমিত থাকতে পারে।
স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার দামও কিছুটা কমেছে। তবে প্লাটিনাম ও প্যালাডিয়ামের বাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। শিল্পখাতে চাহিদা বৃদ্ধির প্রত্যাশায় এই দুটি ধাতুর মূল্য সামান্য বেড়েছে বলে বাজার পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে স্বর্ণ, তেল, ডলার এবং শেয়ারবাজারের গতিপ্রকৃতিতে অস্থিরতা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, বহুমুখী বিনিয়োগ কৌশল এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সূচক পর্যবেক্ষণ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সংঘাত বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও আর্থিক খাতে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলেছে। তেলের দাম ও ডলারের শক্তিশালী অবস্থানের বিপরীতে স্বর্ণের দামে সাময়িক পতন দেখা গেলেও বাজার পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত সংবেদনশীল। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নীতিগত সিদ্ধান্ত আগামী দিনে স্বর্ণবাজারের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
