গবেষকদের দাবি, গর্ভধারণ শুধু মায়ের নয়—শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে পারে সঙ্গীর ওপরও
বমিভাব, অতিরিক্ত ক্লান্তি, ওজন বৃদ্ধি, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন কিংবা মেজাজের ওঠানামা—এসব লক্ষণ সাধারণত গর্ভাবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, অনেক ক্ষেত্রে এসব উপসর্গ দেখা দিতে পারে এমন ব্যক্তির মধ্যেও, যিনি নিজে গর্ভবতী নন। বিশেষ করে হবু বাবা বা গর্ভবতী নারীর ঘনিষ্ঠ সঙ্গীরা ‘কুভাড সিনড্রোম’ (Couvade Syndrome) নামে পরিচিত এক রহস্যময় অবস্থার অভিজ্ঞতা পেতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে গর্ভবতী নন এমন সঙ্গীও গর্ভাবস্থার মতো শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের লক্ষণ অনুভব করেন। বিষয়টি নিয়ে গবেষণা যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে সন্তান আগমনের প্রভাব শুধু গর্ভধারিণী নারীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; পরিবারের অন্য সদস্যদের ওপরও এর গভীর প্রভাব পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ক্যাথরিন ক্যাপনোরোর ভাষায়, কুভাড সিনড্রোমকে “সহানুভূতিজনিত গর্ভাবস্থা” বলা যেতে পারে। এতে গর্ভবতী নন এমন ব্যক্তি বমিভাব, অবসাদ, পিঠব্যথা, দাঁতের ব্যথা, ক্ষুধার পরিবর্তন, খাদ্যের প্রতি আকর্ষণ বা বিতৃষ্ণা এবং ওজন বৃদ্ধির মতো উপসর্গ অনুভব করতে পারেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, এসব উপসর্গ সাধারণত গর্ভাবস্থার প্রথম ও তৃতীয় ত্রৈমাসিকে বেশি দেখা যায় এবং সন্তানের জন্মের পর ধীরে ধীরে কমে যায়।
বিভিন্ন দেশে পরিচালিত গবেষণায় কুভাড সিনড্রোমের উপস্থিতি বিস্ময়করভাবে বেশি পাওয়া গেছে।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৫২ শতাংশ হবু বাবা কোনো না কোনোভাবে এই সিনড্রোমের লক্ষণ অনুভব করেছেন। জর্ডানে এ হার ৫৯ শতাংশ এবং থাইল্যান্ডে ৬১ শতাংশ। পোল্যান্ড ও চীনের কিছু গবেষণায় প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত পুরুষের মধ্যে এ ধরনের অভিজ্ঞতার তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে সুইডেন ও রাশিয়ার মতো দেশে এর হার তুলনামূলক কম বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণায় কুভাড সিনড্রোমের উপস্থিতির প্রমাণ মিললেও এটি এখনো আন্তর্জাতিক রোগ শ্রেণিবিন্যাস (ICD) বা মানসিক রোগ নির্ণয়ের স্বীকৃত নির্দেশিকা DSM-এ অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
ফলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মূলধারায় এটি এখনো আনুষ্ঠানিক রোগ হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। অনেক চিকিৎসকও বিষয়টি সম্পর্কে সীমিত তথ্য জানেন।
গবেষকদের মতে, কুভাড সিনড্রোমের পেছনে একক কোনো কারণ নেই। এটি মানসিক, সামাজিক ও জৈবিক নানা উপাদানের সম্মিলিত ফল হতে পারে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রথমবার বাবা-মা হওয়ার অভিজ্ঞতা অনেকের জন্য গভীর আবেগ, উদ্বেগ এবং দায়িত্ববোধের জন্ম দেয়। ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা, নতুন জীবনযাত্রার প্রস্তুতি এবং পরিবারের পরিবর্তিত বাস্তবতা অনেক সময় শারীরিক উপসর্গের রূপ নিতে পারে।
ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক মনোবিজ্ঞানী কেভিন গ্রুনবার্গের মতে, সন্তানের জন্ম একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি। এই পরিবর্তনের চাপ ও আবেগ অনেক ক্ষেত্রেই শরীরের মাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে।
কিছু গবেষক মনে করেন, গর্ভবতী সঙ্গীর প্রতি গভীর আবেগিক সংযোগ ও সহানুভূতি থেকেও এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, গর্ভবতী নারী যদি কোনো খাবারের গন্ধ সহ্য করতে না পারেন, তাহলে তার সঙ্গীও স্বেচ্ছায় একই খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করতে পারেন। আবার গর্ভাবস্থায় বিশ্রামের সময় বাড়লে সঙ্গীও একই জীবনধারায় অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মানসিক সম্পৃক্ততা কখনো কখনো বাস্তব শারীরিক অনুভূতিতে রূপ নিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, হবু বাবাদের শরীরেও গর্ভকালীন সময়ে কিছু হরমোনগত পরিবর্তন ঘটে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া পুরুষদের মধ্যে টেস্টোস্টেরন ও ইস্ট্রাডিয়ল হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা হয়। গবেষকদের ধারণা, এসব পরিবর্তন পুরুষদের সন্তানের যত্ন নেওয়া ও পারিবারিক দায়িত্ব পালনের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে সহায়তা করে।
এছাড়া কিছু গবেষণায় সন্তানের জন্মের পর বাবাদের মস্তিষ্কেও গঠনগত পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা নবজাতকের সঙ্গে বন্ধন তৈরি ও যত্নশীল আচরণ বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কুভাড সিনড্রোমকে শুধুমাত্র কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি পরিবার, মানসিক স্বাস্থ্য এবং পিতৃত্বের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি করছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ১০ শতাংশ নতুন বাবা সন্তান জন্মের আগে বা পরে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হতে পারেন। একই সময়ে উদ্বেগ ও মানসিক চাপের হারও উল্লেখযোগ্য।
তাই হবু বাবাদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা এবং প্রয়োজন হলে পরামর্শ ও সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কুভাড সিনড্রোম এখনও চিকিৎসাবিজ্ঞানের অমীমাংসিত রহস্যগুলোর একটি। তবে ক্রমবর্ধমান গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সন্তান আগমনের প্রভাব কেবল গর্ভধারণকারী নারীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। হবু বাবাদের শরীর, মন এবং আচরণেও এর সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যেতে পারে। বিষয়টি নিয়ে আরও গবেষণা ভবিষ্যতে মানব আচরণ, পিতৃত্ব এবং পারিবারিক স্বাস্থ্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
