‘লিলিপুটিয়ান হ্যালুসিনেশন’-এর পেছনের রহস্য খুঁজছে গবেষকরা
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পাওয়া এক বিরল প্রজাতির মাশরুম খাওয়ার পর মানুষের চোখে অদ্ভুত এক বিভ্রম দেখা দেয়—তারা নাকি অসংখ্য ক্ষুদ্রাকৃতির মানুষ, পরীসদৃশ প্রাণী কিংবা বামনসদৃশ চরিত্রকে চারপাশে ঘুরে বেড়াতে দেখেন। সম্প্রতি এই রহস্যময় মাশরুম নিয়ে নতুন গবেষণা বিজ্ঞানী মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে। গবেষকদের ধারণা, এই মাশরুমে এমন একটি অজানা রাসায়নিক উপাদান রয়েছে, যা মানব মস্তিষ্কে অত্যন্ত ব্যতিক্রমধর্মী হ্যালুসিনেশন সৃষ্টি করতে সক্ষম।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, চীনের ইউনান প্রদেশে প্রতি বছর বর্ষাকালে স্থানীয় বাজারে একটি বিশেষ মাশরুম বিক্রি হয়, যার বৈজ্ঞানিক নাম Lanmaoa asiatica। স্থানীয়দের কাছে এটি সুস্বাদু খাদ্য হিসেবে পরিচিত হলেও ঠিকমতো রান্না না করলে এটি খাওয়ার পর মানুষ অস্বাভাবিক দৃশ্য দেখতে শুরু করে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রতি বছর শত শত মানুষ এই মাশরুম খেয়ে বিভ্রমজনিত সমস্যায় চিকিৎসা নিতে আসে। অনেক রোগী জানিয়েছেন, তারা খাবারের প্লেট, দেয়াল, আসবাবপত্র কিংবা ঘরের বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট মানুষকে হাঁটতে বা চলাফেরা করতে দেখেছেন।
মনোরোগবিদ্যায় এই ধরনের বিভ্রমকে বলা হয় লিলিপুটিয়ান হ্যালুসিনেশন। এটি এমন একটি বিরল অবস্থা, যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তি ক্ষুদ্রাকৃতির মানুষ, প্রাণী বা কল্পিত চরিত্র দেখতে পান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের বিভ্রম বাস্তব জীবনে অত্যন্ত বিরল। ১৯০৯ সালে প্রথম এই উপসর্গের বর্ণনা পাওয়া যায় এবং ২০২১ সাল পর্যন্ত মাশরুম-সম্পর্কিত নয় এমন মাত্র ২২৬টি ঘটনার তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব উটাহ ও ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের জীববিজ্ঞান গবেষক কলিন ডমনাওয়ার দীর্ঘদিন ধরে এই মাশরুম নিয়ে কাজ করছেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বহু বছর ধরে বিভিন্ন দেশে এই ধরনের মাশরুমের গল্প প্রচলিত থাকলেও বিজ্ঞানীরা নির্দিষ্ট প্রজাতিটি শনাক্ত করতে পারেননি। পরে ইউনানের বিভিন্ন বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে জিনগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় যে Lanmaoa asiatica নামের মাশরুমটিই এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত।
গবেষণার অংশ হিসেবে ডমনাওয়ার ফিলিপাইন্সেও অনুসন্ধান চালান। সেখানে পাওয়া মাশরুমের আকার ও রং কিছুটা ভিন্ন হলেও জেনেটিক পরীক্ষায় দেখা যায়, সেটিও একই প্রজাতির।
এতে ধারণা শক্তিশালী হয়েছে যে এই মাশরুমের প্রভাব কোনো নির্দিষ্ট সংস্কৃতি বা অঞ্চলের কুসংস্কার নয়; বরং এর পেছনে প্রকৃত জৈব-রাসায়নিক কারণ রয়েছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি কোন রাসায়নিক উপাদান এই বিভ্রম সৃষ্টি করে।
গবেষকদের প্রাথমিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, এটি প্রচলিত সাইকেডেলিক উপাদান যেমন সাইলোসাইবিনের মতো নয়। বরং সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো অণু এর জন্য দায়ী হতে পারে।
গবেষণাগারে মাশরুমের নির্যাস পরীক্ষামূলকভাবে প্রাণীদের ওপর প্রয়োগ করার পর আচরণগত পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। তবে মানুষের মধ্যে যে ক্ষুদ্র মানুষের বিভ্রম দেখা যায়, তার নির্দিষ্ট স্নায়ুবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মাশরুমের প্রভাবে সৃষ্ট বিভ্রম সাধারণ সাইকেডেলিক অভিজ্ঞতার তুলনায় অনেক বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে উপসর্গ শুরু হতে ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে এবং বিভ্রম এক থেকে তিন দিন স্থায়ী হতে পারে। এমনকি গুরুতর অবস্থায় রোগীকে এক সপ্তাহ পর্যন্ত হাসপাতালে থাকতে হয়েছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।
এই দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কারণেই গবেষকরা নিজেরাও মাশরুমটি সরাসরি পরীক্ষামূলকভাবে গ্রহণ করতে সতর্কতা অবলম্বন করছেন।
গবেষকদের বিশ্বাস, এই মাশরুমের কার্যকারিতা বোঝা গেলে মানব মস্তিষ্কে দৃশ্যগত বিভ্রম কীভাবে তৈরি হয়, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
বিশেষ করে যেসব মানুষ কোনো মাদক বা বিষাক্ত পদার্থ ছাড়াই হঠাৎ লিলিপুটিয়ান হ্যালুসিনেশনে আক্রান্ত হন, তাদের চিকিৎসা ও স্নায়ুবিজ্ঞান গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।
মাইকোলজিস্ট বা ছত্রাক বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবীর মোট ছত্রাক প্রজাতির ৫ শতাংশেরও কম এখন পর্যন্ত বৈজ্ঞানিকভাবে শনাক্ত করা হয়েছে।
ফলে অজানা এই মাশরুমের মতো আরও বহু জীব ভবিষ্যতে চিকিৎসাবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান এবং ওষুধ গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
চীনের বনাঞ্চলে জন্ম নেওয়া Lanmaoa asiatica নামের এই রহস্যময় মাশরুম শুধু একটি খাদ্য উপাদান নয়, বরং মানব মস্তিষ্কের জটিল কার্যপ্রণালী বোঝার নতুন চাবিকাঠি হয়ে উঠতে পারে। ক্ষুদ্র মানুষের বিভ্রমের মতো বিরল অভিজ্ঞতার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে গবেষকরা হয়তো ভবিষ্যতে এমন নতুন রাসায়নিক উপাদান আবিষ্কার করবেন, যা স্নায়ুবিজ্ঞান ও চিকিৎসা গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
