নতুন জনশক্তি রপ্তানিতে শ্লথগতি, তবে রেমিট্যান্সে দেখা যাচ্ছে ইতিবাচক প্রবণতা
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। বিদেশে নতুন কর্মী পাঠানোর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় জনশক্তি রপ্তানি খাত নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও একই সময়ে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তবুও দীর্ঘমেয়াদে শ্রমবাজারের এই সংকোচন দেশের অর্থনীতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তিন মাসে বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ থেকে গেছেন ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৩৬ জন কর্মী। আগের বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৬০ হাজার ৪৩৮ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিদেশগামী শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৪১ শতাংশ কমেছে।
শ্রমবাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে বিভিন্ন দেশে নতুন জনশক্তি নিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে শ্রম আমদানিকারক দেশগুলো নতুন করে কর্মী নিয়োগে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে যে কর্মীরা বিদেশে যাচ্ছেন, তাদের বেশিরভাগই যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরুর আগেই অনুমোদিত ভিসা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার আওতায় ছিলেন। নতুন চাহিদা কমে যাওয়ায় আগামী মাসগুলোতে শ্রমবাজারে এর আরও বড় প্রভাব দেখা যেতে পারে।
বর্তমানে সৌদি আরব ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের বড় শ্রমবাজারগুলোতে নিয়োগ কার্যক্রম তুলনামূলক সীমিত। সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিয়োগের সুযোগ কমেছে, কাতার ও কুয়েতে কর্মী গ্রহণের হারও নিম্নমুখী। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ থাকায় বাংলাদেশের শ্রম রপ্তানি খাত অতিরিক্ত চাপের মুখে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপের কয়েকটি দেশে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলেও ভিসা প্রক্রিয়ার জটিলতা, ভাষাগত দক্ষতা এবং কনস্যুলার সীমাবদ্ধতার কারণে সাধারণ কর্মীরা সহজে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারছেন না।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক শ্রমবাজারের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরশীলতা এখনো অনেক বেশি রয়ে গেছে।
বিদেশে নতুন কর্মী পাঠানোর হার কমলেও প্রবাসী আয়ে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকে জুনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে এসেছে ৩৩ দশমিক ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ২৮ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার।
এক বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ শতাংশের বেশি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, যুদ্ধ ও অনিশ্চয়তার কারণে অনেক প্রবাসী তাদের সঞ্চিত অর্থ দ্রুত দেশে পাঠাচ্ছেন। পাশাপাশি বৈধ চ্যানেলে অর্থ প্রেরণে সরকারি প্রণোদনা এবং হুন্ডি নিয়ন্ত্রণে নজরদারি বৃদ্ধিও রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
শ্রমবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, যদি আঞ্চলিক সংঘাত দীর্ঘায়িত না হয়, তাহলে বছরের শেষভাগে পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে বড় ক্রীড়া আয়োজন, অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, হোটেল ও সেবাখাত সম্প্রসারণের ফলে নতুন শ্রম চাহিদা সৃষ্টি হতে পারে।
বিশেষ করে নির্মাণ, পরিবহন, আতিথেয়তা ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবাখাতে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হওয়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকার আগামী অর্থবছরে প্রায় ১৪ লাখ বাংলাদেশি কর্মীকে বিদেশে কর্মসংস্থানের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্যে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি তৈরির পাশাপাশি নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান এবং বিদ্যমান বাজার সম্প্রসারণে কাজ চলছে।
মালয়েশিয়া, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজার পুনরায় সক্রিয় করতে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের শ্রমবাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেললেও রেমিট্যান্স প্রবাহ এখনো অর্থনীতিকে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে কর্মী রপ্তানির গতি পুনরুদ্ধার করতে না পারলে বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাত বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। তাই নতুন বাজার অনুসন্ধান, দক্ষ জনশক্তি উন্নয়ন এবং কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করাই এখন সময়ের দাবি।
