দ্বৈত কর চুক্তি, বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং কৌশলগত অংশীদারত্বে অগ্রগতির ঘোষণা
সৌদি আরব ও কানাডা অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি এবং বিনিয়োগ সুরক্ষা সংক্রান্ত সমঝোতার পথে এগোচ্ছে। দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি খনিজ সম্পদ, জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং অবকাঠামো খাতে সহযোগিতা আরও গভীর করার বিষয়ে উভয় দেশ একমত হয়েছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সৌদি আরব সফর শেষে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, দুই দেশ দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করতে সম্মত হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৭ সালের শুরুতে একটি বিনিয়োগ উন্নয়ন ও সুরক্ষা চুক্তি (Investment Promotion and Protection Agreement) সম্পাদনের লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।
সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান এবং কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির বৈঠকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদারের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়।
বিবৃতিতে জানানো হয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও কনস্যুলার সহযোগিতা বাড়াতে ‘সৌদি-কানাডীয় সমন্বয় পরিষদ’ গঠন করা হবে। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা যৌথভাবে এই পরিষদের কার্যক্রম তদারকি করবেন।
এছাড়া বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার রূপরেখা নির্ধারণে একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনা দলিলও উন্মোচন করা হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
দুই দেশ বৃহৎ অবকাঠামো ও কৌশলগত প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য নিজ নিজ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সৌদি আরব কানাডীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য দেশটির উদীয়মান অর্থনৈতিক খাতগুলোতে বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরেছে। অন্যদিকে কানাডা ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে টরন্টোতে অনুষ্ঠিতব্য প্রথম ‘ইনভেস্টমেন্ট সামিট’-এ সৌদি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ২০২০ সালের পর থেকে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ২ হাজার কোটি ডলারের বেশি অতিক্রম করেছে। এই ধারা আরও শক্তিশালী করতে পারস্পরিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি, তেলবহির্ভূত বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তায় কাজ করার বিষয়ে একমত হয়েছে উভয় পক্ষ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরব তার অর্থনীতিকে তেলনির্ভরতা থেকে বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে খনিজ খাতে বড় বিনিয়োগ করছে। এই প্রেক্ষাপটে খনিজ ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানে কানাডীয় কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, সৌদি আরবের শিল্প ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে ইস্যুকৃত অনুসন্ধান লাইসেন্সের সবচেয়ে বড় অংশ বর্তমানে কানাডীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে রয়েছে। ২০২৬ সালের শুরুতে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে এই সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও নতুন সমঝোতা হয়েছে।
দুই দেশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), নবায়নযোগ্য জ্বালানি, হাইড্রোজেন উৎপাদন, কার্বন ব্যবস্থাপনা, সাইবার নিরাপত্তা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতার সুযোগ অনুসন্ধানের বিষয়ে একমত হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা, জৈবপ্রযুক্তি, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধ শিল্প এবং গবেষণা খাতেও যৌথ উদ্যোগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা নিয়েও আলোচনা হয়।
হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে দুই দেশ নিরাপদ ও বাধাহীন নৌ চলাচল নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি সমর্থনও পুনর্ব্যক্ত করা হয়। সৌদি আরব কানাডার ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
দুই দেশের মধ্যে বিমান যোগাযোগ সম্প্রসারণ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। পূর্বে স্বাক্ষরিত বিমান চলাচল চুক্তির আওতায় যাত্রী ও কার্গো পরিবহন বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
এছাড়া রিয়াদ এক্সপো-২০৩০ এবং ২০৩৪ সালের ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনকে সামনে রেখে অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ কর্মসূচি এবং কানাডার উন্নত প্রযুক্তি ও খনিজ খাতের সক্ষমতা একত্রিত হলে দুই দেশের মধ্যে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক জোট গড়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি রূপান্তর, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিল্পে এই অংশীদারত্ব ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সৌদি আরব ও কানাডার সাম্প্রতিক সমঝোতাগুলো শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন দিগন্তই উন্মোচন করছে না, বরং খনিজ সম্পদ, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার ভিত্তিও শক্তিশালী করছে। দ্বৈত কর চুক্তি ও বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
