বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের তাগিদ
চট্টগ্রাম ও দেশের অন্যান্য বন্যাপ্রবণ অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তব অগ্রগতি দেখতে চায় জনগণ বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। শুক্রবার (১০ জুলাই) চট্টগ্রামে বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের কয়েকটি বিভাগ বর্তমানে বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি রয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর এবং ময়মনসিংহ অঞ্চলের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, উজানের পানি প্রবাহ ও বাঁধ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন ঘটলে রংপুর বিভাগ আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
তিনি বলেন, তিস্তা অববাহিকাকেন্দ্রিক দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহল থেকে উত্থাপিত হয়ে আসছে। এ বিষয়ে সরকারও ইতিবাচক অবস্থান ও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এখন জনগণ সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চায়।
জামায়াত আমিরের ভাষ্য, প্রকল্পটি আকারে বড় হওয়ায় বাস্তবায়নে সময় লাগতে পারে, তবে কাজের দৃশ্যমান সূচনা হওয়া জরুরি। জনগণ জানতে চায় প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে সরকার কতদূর অগ্রসর হয়েছে এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী।
চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করাই তাদের সফরের মূল উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি দাবি উত্থাপনের কথাও জানান তিনি।
বন্যা ও পাহাড়ধসে প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের প্রধান বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রাম সামান্য ভারী বর্ষণেই জলাবদ্ধতা ও নাগরিক দুর্ভোগে আক্রান্ত হয়। নালা-নর্দমা ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে প্রতিবছর একই ধরনের সমস্যার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।
তিনি বলেন, এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। তবে বিরোধী দল হিসেবেও জনগণের সমস্যা তুলে ধরা এবং কার্যকর সমাধানের দাবি জানানো তাদের দায়িত্বের অংশ।
সফরসূচির অংশ হিসেবে বাঁশখালী, লোহাগাড়া ও সাতকানিয়াসহ বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। বন্যাদুর্গত মানুষের বাস্তব অবস্থা সরেজমিনে দেখে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের আশ্বাসও দেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দলীয় সামর্থ্যের মধ্যে থেকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এবং নিহতদের স্বজনদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা হবে। এ লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন সাংগঠনিক ইউনিটকে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং কেন্দ্রীয়ভাবে বিষয়টি সমন্বয় করা হচ্ছে।
পরে তিনি চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার গুনাগরি এলাকা এবং সাতকানিয়া উপজেলার এওচিয়া ইউনিয়নের বকশিরখিলসহ কয়েকটি বন্যাকবলিত অঞ্চলে গিয়ে দুর্গত মানুষের মাঝে ত্রাণসামগ্রী ও আর্থিক সহায়তা বিতরণ করেন।
তিস্তা নদীকেন্দ্রিক দীর্ঘদিনের পানি ব্যবস্থাপনা সংকট, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি এবং নদীভাঙন রোধে একটি সমন্বিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি বহু বছর ধরে আলোচনায় রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে।
তিস্তা অববাহিকার উন্নয়ন শুধু বন্যা নিয়ন্ত্রণেই নয়, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচ সুবিধার সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে দুর্যোগজনিত ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে স্থানীয় জনগণের জীবনমান উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে মানুষের দুর্ভোগ এবং তিস্তা অববাহিকার দীর্ঘমেয়াদি সংকটের প্রেক্ষাপটে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সরকারের প্রতিশ্রুতির পর প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি কত দ্রুত দৃশ্যমান হয়, সেটিই এখন সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মানুষের প্রধান প্রত্যাশা।
