পাহাড় কাটা, অবৈধ দখল ও পুনর্বাসন সংকটে বাড়ছে ভূমিধসের ঝুঁকি
কক্সবাজারের বিভিন্ন পাহাড়ে গড়ে ওঠা হাজার হাজার অবৈধ বসতি নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টিপাতে জেলার বিভিন্ন স্থানে ভূমিধসের ঘটনায় অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ বছরে পাহাড়ধসে প্রাণ হারিয়েছেন ৩১২ জন। অথচ পাহাড় কাটা, অবৈধ দখল এবং কার্যকর পুনর্বাসন ব্যবস্থার অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলো এখনো বহাল রয়েছে।
জানা গেছে, কক্সবাজার পৌর এলাকার ছোট-বড় অন্তত ৫১টি পাহাড়ে বর্তমানে প্রায় ২২ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি রয়েছে। এসব বসতিতে বসবাস করছেন দুই লাখেরও বেশি মানুষ। তাদের বড় অংশই নিম্নআয়ের শ্রমজীবী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত পরিবার এবং ভাসমান জনগোষ্ঠী।
বর্ষা মৌসুম এলেই কক্সবাজার শহরের পাহাড়ঘেরা এলাকাগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পাহাড়ের ঢাল ও পাদদেশে বসবাসকারীরা প্রতিদিনই ভূমিধসের ঝুঁকি নিয়ে জীবনযাপন করেন। ভারী বর্ষণের সময় পাহাড়ে ফাটল সৃষ্টি হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে মুহূর্তেই ধসে পড়ে ঘরবাড়ির ওপর।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ঝুঁকির বিষয়টি জানা থাকলেও বিকল্প আবাসনের অভাবে তারা এসব এলাকা ছাড়তে পারছেন না। ফলে প্রতি বর্ষায় তাদের জীবন অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটে।
চলতি সপ্তাহের টানা বৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন এলাকায় চার শতাধিক ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় পাঁচজন শিক্ষার্থীসহ অন্তত ২২ জনের প্রাণহানি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অসংখ্য পরিবার।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষ সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান এখনো হয়নি। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিনে অন্তত পাঁচ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার শহরের বাদশাঘোনা, পাহাড়তলী, কলাতলী, খাজা মঞ্জিল, লারপাড়া, ফাতেরঘোনা, ছাত্তারঘোনা ও আশপাশের বহু এলাকায় পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণের প্রবণতা এখনো থামেনি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ভূমিদস্যু চক্রের সহায়তায় পাহাড়ি জমি দখল করে বসতি গড়ে তোলা হচ্ছে। নতুন নতুন ঘর নির্মাণের পাশাপাশি পাহাড় কাটার ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনিক অভিযান পরিচালিত হলেও তা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হচ্ছে না। বর্ষা মৌসুমে কিছুদিন তৎপরতা দেখা গেলেও পরে পরিস্থিতি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড় কাটা শুধু ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে না, একই সঙ্গে পরিবেশগত ভারসাম্যও নষ্ট করছে। পাহাড়ের গাছপালা ধ্বংস হওয়ায় বন্য প্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। অন্যদিকে বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে মাটিতে শোষিত না হয়ে সরাসরি নিচে নেমে আসায় শহরে জলাবদ্ধতা বাড়ছে।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, পাহাড় ধ্বংসের ফলে নগর এলাকার ড্রেন ও নালাগুলো মাটি ও বালুতে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে অল্প সময়ের বৃষ্টিতেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
পরিবেশবিষয়ক সংগঠনগুলোর জরিপ অনুযায়ী, ২০০৮ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত কক্সবাজারে পাহাড়ধসে মোট ৩১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীও রয়েছেন।
সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে ২০১০ সালে, যখন একদিনের প্রবল বর্ষণে ৬২ জনের প্রাণহানি হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন সময়ে বড় ও ছোট আকারের ভূমিধসের ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল অব্যাহত রয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর ও বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকের বেশি সময়ে পাহাড় কাটার অভিযোগে শত শত মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবুও পাহাড় ধ্বংস পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
কর্মকর্তারা বলছেন, দুর্গম এলাকা, জনবল সংকট এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না। বিশেষ করে রাতের অন্ধকারে পাহাড় কাটার ঘটনা বেশি ঘটে।
বিশ্লেষকদের মতে, কেবল উচ্ছেদ অভিযান দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী নিম্নআয়ের মানুষদের জন্য টেকসই পুনর্বাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পাহাড় দখল ও কাটার সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
নচেৎ প্রতি বর্ষায় কক্সবাজারের পাহাড়গুলো নতুন করে প্রাণহানি, পরিবেশ বিপর্যয় এবং মানবিক সংকটের কারণ হয়ে উঠবে।
