সচিব কমিটির বৈঠকে অনুমোদনের অপেক্ষা; নিম্ন গ্রেডে সর্বোচ্চ ১৪০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বহুল প্রত্যাশিত নবম পে-স্কেলের সুপারিশ চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, প্রথম থেকে দশম গ্রেডের কর্মকর্তাদের মূল বেতন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত এবং ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন সর্বোচ্চ ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। বুধবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সচিব কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলায় সহায়তা করার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। বৈঠকে সুপারিশ অনুমোদিত হলে তা পরবর্তী ধাপে সরকারের উচ্চপর্যায়ে পাঠানো হবে।
প্রস্তাবিত নবম পে-স্কেল অনুযায়ী, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মূল বেতন দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে নিম্ন ও মধ্যম স্তরের কর্মচারীদের জন্য আরও বেশি হারে বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা লাঘব হয়।
অর্থ ও জনপ্রশাসন সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকেই নতুন স্কেলের মূল বেতন কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বিভিন্ন ভাতা ধাপে ধাপে পরিশোধ করা হতে পারে, যাতে সরকারের ওপর এককালীন আর্থিক চাপ কমে।
নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে বর্তমানে চালু থাকা বিশেষ অন্তর্বর্তীকালীন ভাতা বাতিল হতে পারে বলেও জানা গেছে। কারণ মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় অতিরিক্ত ভাতা বহাল রাখার প্রয়োজনীয়তা কমে যাবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি কর্মচারীদের আয় বৃদ্ধি ভোগব্যয় বাড়াতে পারে, যা অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ চাহিদা শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনে দক্ষতা ও কর্মপ্রেরণা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে রাজস্ব আয় ও বাজেট ব্যবস্থাপনার সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদে সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হতে পারে।
সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদের মতে, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। তিনি মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতির কারণে কর্মচারীদের প্রকৃত আয় কমে গেছে। নতুন পে-স্কেল তাদের জীবনমান রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তার মতে, অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সরকারি বেতন বৃদ্ধি সরাসরি উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণ হয়নি। ফলে এ বিষয়ে অযথা উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই।
সচিব কমিটির সুপারিশ চূড়ান্ত হলে তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে। পরবর্তী ধাপে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর অর্থ বিভাগ আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করবে। প্রয়োজন হলে খসড়া সুপারিশ আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের জন্যও পাঠানো হতে পারে।
বাংলাদেশে সর্বশেষ অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হয়েছিল এক দশকেরও বেশি সময় আগে। এরপর দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনের কারণে নতুন বেতন কাঠামোর দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের সেই প্রত্যাশার বাস্তবায়ন ঘটতে যাচ্ছে নবম পে-স্কেলের মাধ্যমে।
নবম পে-স্কেল বাস্তবায়িত হলে দেশের লাখো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী সরাসরি উপকৃত হবেন। একই সঙ্গে এটি সরকারি প্রশাসনের কর্মদক্ষতা, প্রেরণা এবং সেবার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এখন সংশ্লিষ্টদের নজর সচিব কমিটির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী সরকারি অনুমোদনের দিকে।
