হরমুজের পর বাব-এল-মান্দেব নিয়েও উদ্বেগ; বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ও বাণিজ্যে বড় প্রভাবের আশঙ্কা
মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বাণিজ্যিক রুটগুলোকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর চাপ বাড়াতে আঞ্চলিক জ্বালানি পরিবহন করিডরগুলো বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। বিশ্লেষকদের মতে, এই হুমকি বাস্তবায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
বুধবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানায়, আঞ্চলিক জ্বালানি রপ্তানির সুবিধা যদি সবার জন্য নিশ্চিত না হয়, তবে কেউই সেই সুবিধা ভোগ করতে পারবে না। এমন বক্তব্যকে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে সরাসরি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।
এই হুমকির আগে হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। একই সময়ে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরান ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর মাধ্যমে লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত বাব-এল-মান্দেব প্রণালির কার্যক্রমও ব্যাহত করার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাব-এল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং এটি বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর বিপুল পরিমাণ তেল ও পণ্যবাহী জাহাজ এই রুট ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে থাকে।
হুতি নেতৃত্বের সাম্প্রতিক বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, ইয়েমেনে সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকলে তারা বাব-এল-মান্দেব প্রণালির কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ ও বাব-এল-মান্দেব—দুই গুরুত্বপূর্ণ করিডর একসঙ্গে ঝুঁকির মুখে পড়লে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। এতে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনে হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন স্থাপনায় হামলা এবং পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনায় দীর্ঘদিনের যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। এর ফলে লোহিত সাগর ও আশপাশের সমুদ্রাঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, অতীতেও হুতিরা লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল। ফলে নতুন করে একই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় চাপ বাড়বে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনাও বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্কিন বাহিনী ইরানের সামরিক স্থাপনায় অভিযান চালানোর দাবি করেছে। অপরদিকে ইরানও বিভিন্ন মার্কিন স্থাপনায় পাল্টা হামলার কথা জানিয়েছে।
এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। কূটনৈতিক সমাধানের পরিবর্তে সামরিক উত্তেজনা বাড়তে থাকলে আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মত আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্রপথগুলোর ওপর নির্ভরশীল। ফলে এসব রুটে অস্থিরতা দেখা দিলে তেলের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠতে পারে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব খাদ্য, পরিবহন এবং শিল্প উৎপাদন খাতেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্রপথ ঘিরে নতুন করে তৈরি হওয়া উত্তেজনা শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের কারণ। কূটনৈতিক সমাধান ব্যর্থ হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।
