গোপনীয়তা ও সম্মতি নিয়ে বিতর্ক; ব্যবহারকারীদের প্রতিক্রিয়ার মুখে বন্ধ ‘মিউজ ইমেজ’
ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা ও ব্যক্তিগত ছবির অননুমোদিত ব্যবহারের আশঙ্কা ঘিরে তীব্র বিতর্কের মুখে ইনস্টাগ্রামের নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ছবি তৈরির ফিচার ‘মিউজ ইমেজ’ প্রত্যাহার করেছে মেটা। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ফিচারটি প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, শিল্পী, অভিনয়শিল্পী এবং বিভিন্ন অধিকার সংগঠনের সমালোচনার মুখে পড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটি ফিচারটি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
সম্প্রতি মেটা তাদের নতুন এআইচালিত ছবি তৈরির টুল ‘মিউজ ইমেজ’ চালু করে। এটি ছিল মেটার সুপারইন্টেলিজেন্স ল্যাবের প্রথম ইমেজ জেনারেশন প্রযুক্তি। ফিচারটির মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা কোনো পাবলিক ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের ছবি রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করে নতুন এআই-নির্ভর ছবি তৈরি করতে পারতেন।
তবে শুরু থেকেই এ ফিচারটি গোপনীয়তা ও সম্মতির প্রশ্নে বিতর্কের জন্ম দেয়। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, যাদের ছবি এআইয়ের মাধ্যমে ব্যবহার করা হচ্ছে, তাদেরকে এ বিষয়ে কোনো নোটিফিকেশন দেওয়া হচ্ছিল না। ফলে ব্যক্তিগত পরিচয়, চেহারা ও ডিজিটাল উপস্থিতি অননুমোদিতভাবে ব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হয়।
ফিচারটি চালুর পরপরই বিভিন্ন শিল্পী ও অভিনয়শিল্পী এর বিরোধিতা করেন। এমি পুরস্কারজয়ী অভিনেত্রী হ্যানা এইনবাইন্ডার প্রকাশ্যে ব্যবহারকারীদের এ ফিচার বন্ধ রাখার আহ্বান জানান। তিনি অভিযোগ করেন, অনেক ক্ষেত্রে ফিচারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় অবস্থায় ছিল, যা ব্যবহারকারীদের অজান্তেই তাদের কনটেন্ট ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করছিল।
অভিনয়শিল্পীদের সংগঠন স্যাগ-আফট্রাও (SAG-AFTRA) বিষয়টিকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করে। সংগঠনটির মতে, ব্যবহারকারীদের স্পষ্ট সম্মতি ছাড়া এমন প্রযুক্তি চালু করা ডিজিটাল অধিকার ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে মেটা। এক ব্লগ পোস্টে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তারা এমন একটি সৃজনশীল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে চেয়েছিল, যেখানে ব্যবহারকারীরা তাদের পাবলিক কনটেন্ট কীভাবে ব্যবহৃত হবে সে বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবেন।
তবে ব্যবহারকারীদের প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করে প্রতিষ্ঠানটি উপলব্ধি করেছে যে, ফিচারটি প্রত্যাশিত আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে ‘মিউজ ইমেজ’ আর চালু রাখা হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার নতুন সুযোগ তৈরি করলেও এর সঙ্গে বাড়ছে অপব্যবহারের আশঙ্কা। বিশেষ করে কারও অনুমতি ছাড়া তার ছবি ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর, ভুয়া বা আপত্তিকর কনটেন্ট তৈরি করার অভিযোগ বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
নারী তারকা, জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব এবং সাধারণ ব্যবহারকারীদের ছবি ব্যবহার করে ভুয়া কনটেন্ট তৈরির ঘটনা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রযুক্তি খাতে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ফলে এআই ব্যবহারে স্বচ্ছতা, ব্যবহারকারীর সম্মতি এবং শক্তিশালী নিরাপত্তা নীতিমালা নিশ্চিত করার দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মেটার এই সিদ্ধান্ত প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। নতুন প্রযুক্তি চালুর ক্ষেত্রে শুধুমাত্র উদ্ভাবন নয়, ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা, নৈতিকতা এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাও সমানভাবে বিবেচনায় রাখতে হবে।
মিউজ ইমেজ ফিচার বন্ধের ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি ব্যবহারকারীর আস্থা অর্জনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবির সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে উন্নত প্রযুক্তিও সহজেই বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। ভবিষ্যতে এআইভিত্তিক সেবা চালুর ক্ষেত্রে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে।
