অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে নতুন নীতিমালা কার্যকর হওয়ার এক বছর পরও কিশোর-কিশোরীদের কাছে খাদ্যাভ্যাসজনিত রোগ (ইটিং ডিসঅর্ডার) উৎসাহিত করে এমন ভিডিও সুপারিশ করছে ইউটিউব। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।
ডিজিটাল ঘৃণা ও ক্ষতিকর অনলাইন কার্যক্রম মোকাবিলায় কাজ করা গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর কাউন্টারিং ডিজিটাল হেট (CCDH) একটি পরীক্ষামূলক গবেষণায় ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীর কাল্পনিক অ্যাকাউন্ট তৈরি করে। ওই অ্যাকাউন্ট থেকে খাদ্যনিয়ন্ত্রণ, ওজন কমানো এবং শরীরের গঠনসংক্রান্ত কিছু ভিডিও দেখার পর ইউটিউবের ‘আপ নেক্সট’ অ্যালগরিদম কী ধরনের ভিডিও সুপারিশ করে তা বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, পরবর্তী ১০০টি সুপারিশকৃত ভিডিওর মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশে চরম ক্যালরি নিয়ন্ত্রণ, অতিরিক্ত রোগা হওয়ার প্রচারণা বা ইটিং ডিসঅর্ডারকে উৎসাহিত করে এমন উপাদান ছিল। তবে ২০২৪ সালের তুলনায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। সে সময় একই ধরনের পরীক্ষায় প্রতি চারটি ভিডিওর মধ্যে একটি ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল।
ইউটিউবের মালিক প্রতিষ্ঠান গুগল জানিয়েছে, ক্ষতিকর কনটেন্ট প্রতিরোধে তাদের অবস্থান কঠোর। গবেষণায় চিহ্নিত ভিডিওগুলো ইতোমধ্যে সরিয়ে ফেলা হয়েছে এবং সেগুলো প্রতিষ্ঠানটির কমিউনিটি নীতিমালা লঙ্ঘন করেছিল।
এই প্রতিবেদন এমন সময়ে প্রকাশিত হলো, যখন যুক্তরাজ্যের টেলিকম নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফকম সম্প্রতি মন্তব্য করেছে যে ইউটিউব ও টিকটক এখনো শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাজ্যের অনলাইন সেফটি অ্যাক্ট-এর গুরুত্বপূর্ণ কিছু ধারা কার্যকর হয়। ওই আইনের আওতায় ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ১৮ বছরের কম বয়সীদের আত্মহত্যা, আত্মক্ষতি এবং খাদ্যাভ্যাসজনিত রোগকে উৎসাহিত করে এমন কনটেন্ট থেকে সুরক্ষা দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়। পাশাপাশি অ্যালগরিদমের মাধ্যমে ক্ষতিকর কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমানোর নির্দেশনাও রয়েছে।
নিয়ম ভঙ্গ করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বৈশ্বিক আয়ের ১০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা করা হতে পারে।
ইংল্যান্ডের লেস্টারের বাসিন্দা ২২ বছর বয়সী জ্যাজমিন কৌর জানান, ১৩ বছর বয়সে তার অ্যানোরেক্সিয়া ধরা পড়ে এবং পরবর্তী ছয় বছর তিনি এনএইচএসের চিকিৎসা নিয়েছেন।
তার ভাষায়, শুরুতে বিষয়টি নিরীহ মনে হয়েছিল। সুস্থ ও ফিট থাকতে চেয়ে তিনি অনলাইনে বিভিন্ন তথ্য খুঁজতে শুরু করেন। কিন্তু ধীরে ধীরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু কনটেন্ট তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থাকে আরও খারাপ করে তোলে।
জ্যাজমিন বলেন, “হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার পরও আমি প্রায় সবসময় ফোন ব্যবহার করতাম। পরে এমন চরম ধরনের কনটেন্ট দেখতে শুরু করি, যা আমার দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।”
বর্তমানে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার সীমিত করেছেন এবং শিশু নার্সিং বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি একটি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে কাজ করছেন।
সিসিডিএইচ-এর জ্যেষ্ঠ গবেষণা ব্যবস্থাপক আলেকজান্দ্রা জনসন বলেন, গবেষণার ফলাফল থেকে কিছুটা আশাবাদ পাওয়া যায়, কারণ নিয়ন্ত্রণমূলক আইন কার্যকর হওয়ার পর ক্ষতিকর ভিডিওর সংখ্যা কমেছে। তবে তার মতে, “এ ধরনের একটি ভিডিওও বেশি। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের জন্য অ্যালগরিদমের সামান্য প্রভাবও গুরুতর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।”
গবেষণায় এমন ভিডিওও পাওয়া গেছে, যেখানে মাত্র ১৭০ ক্যালরির খাদ্যতালিকা অনুসরণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যা কিশোর-কিশোরীদের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যমানের তুলনায় অনেক কম। এছাড়া অতিরিক্ত রোগা হওয়ার প্রচারণামূলক ভিডিও এবং বিভ্রান্তিকর ওজন কমানোর কনটেন্টও শনাক্ত হয়েছে।
ইউটিউবের এক মুখপাত্র জানান, প্রতিষ্ঠানটি এমন সব কনটেন্ট নিষিদ্ধ করে, যা ইটিং ডিসঅর্ডারকে উৎসাহিত করে বা সে বিষয়ে নির্দেশনা দেয়। তবে সুস্থতা অর্জন ও পুনরুদ্ধারের অভিজ্ঞতা শেয়ার করা কনটেন্ট অনুমোদিত।
তিনি বলেন, “দর্শকদের সুস্থতা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, এনএইচএস, মাইন্ড এবং দ্য মিক্সের মতো সংস্থার সঙ্গে কাজ করে আমরা আমাদের নীতিমালা নিয়মিত উন্নত করছি।”
ইটিং ডিসঅর্ডার বিষয়ক দাতব্য সংস্থা বিট-এর প্রধান নির্বাহী ভেনেসা লংলি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে ইটিং ডিসঅর্ডারের সম্পর্ক জটিল। ইতিবাচক ও সহায়ক কনটেন্ট অনেকের জন্য উপকারী হলেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ অনলাইনে ক্ষতিকর কনটেন্টের মুখোমুখি হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, ব্যবহারকারীরা অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখতে পারেন, স্ক্রিন টাইম সীমিত করার অ্যাপ ব্যবহার করতে পারেন এবং অনাকাঙ্ক্ষিত কনটেন্টে “নট ইন্টারেস্টেড” অপশন নির্বাচন করতে পারেন। পাশাপাশি ক্ষতিকর কনটেন্ট প্রচারকারী অ্যাকাউন্ট ব্লক বা রিপোর্ট করারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শেষ পর্যন্ত নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোরই।
