প্রেম বা দাম্পত্য সম্পর্কে মাঝে মাঝে সন্দেহ বা অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন এসব সন্দেহ দীর্ঘস্থায়ী, অনিয়ন্ত্রিত এবং মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা ‘রিলেশনশিপ অবসেসিভ-কমপালসিভ ডিসঅর্ডার’ (রিলেশনশিপ ওসিডি বা ROCD)-এর লক্ষণ হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের লিডসের ২৪ বছর বয়সী সোফিয়া জানান, এক বছরের বেশি সময় ধরে তিনি একটি সুখী সম্পর্কে থাকলেও সম্পর্ক নিয়ে অবিরাম সন্দেহ তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। তিনি সবসময় ভাবতেন, তিনি কি সত্যিই তার প্রেমিককে ভালোবাসেন, তারা একে অপরের জন্য উপযুক্ত কি না, এমনকি তিনি প্রতারণা করে ফেলবেন কি না—এসব চিন্তা তাকে তাড়া করে ফিরত।
সোফিয়ার ভাষায়, “আমি এতটাই আতঙ্কিত ছিলাম যে বাড়ির বাইরে যেতে ভয় পেতাম। মনে হতো, বাইরে গেলে হয়তো প্রেমিকের সঙ্গে প্রতারণা করে ফেলব। একসময় কাজেও যেতে পারতাম না। সারাদিন বিছানায় শুয়ে থেকে চ্যাটজিপিটিকে শত শত প্রশ্ন করতাম, শুধু আশ্বস্ত হওয়ার জন্য।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ সম্পর্কগত সংশয় ও রিলেশনশিপ ওসিডির মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। লন্ডনের সাউথ লন্ডন অ্যান্ড মডসলে এনএইচএস ট্রাস্টের পরামর্শক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডেভিড ভেইল জানান, এই সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা এমন সব অনুপ্রবেশকারী চিন্তায় ভোগেন, যা দিনের বড় অংশজুড়ে তাদের মানসিক শক্তি ও মনোযোগ দখল করে রাখে।
তার মতে, “সাধারণ সম্পর্কে যে ধরনের প্রশ্ন বা সংশয় আসে, সেগুলো সাময়িক। কিন্তু রিলেশনশিপ ওসিডিতে এসব চিন্তা সারাক্ষণ মাথায় ঘুরতে থাকে এবং তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করে।”
যুক্তরাজ্যে মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশ ওসিডিতে আক্রান্ত হলেও রিলেশনশিপ ওসিডির আলাদা কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে গবেষকরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং এ বিষয়ে গবেষণা বাড়ার ফলে এখন আগের তুলনায় বেশি মানুষ চিকিৎসা ও সহায়তা নিতে এগিয়ে আসছেন।
ইসরায়েলের রাইখম্যান ইউনিভার্সিটির ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট অধ্যাপক গাই ডোরন জানান, রিলেশনশিপ ওসিডি সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে। এক ক্ষেত্রে ব্যক্তি নিজের অনুভূতি নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েন, অন্য ক্ষেত্রে সঙ্গীর সম্ভাব্য ত্রুটি বা সীমাবদ্ধতা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তায় ভোগেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়া, একসঙ্গে বসবাস শুরু করা বা বিয়ের মতো জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলো অনেক সময় এই সমস্যার সূচনা ঘটাতে পারে।
সোফিয়া জানান, আগে তার ওসিডি জীবাণুভীতি ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত উদ্বেগকে কেন্দ্র করে ছিল। তবে প্রেমের সম্পর্ক গভীর হওয়ার পর সেই উদ্বেগ সম্পর্কের দিকে স্থানান্তরিত হয়। এমনকি প্রেমিকের পোশাক বা চুলের স্টাইল পছন্দ না হলেও তিনি সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করতেন।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ব্রিস্টলের ২৪ বছর বয়সী গ্রেসি, যিনি সাত বছর ধরে রিলেশনশিপ ওসিডির সঙ্গে লড়ছেন। তিনি বলেন, “আমরা ভালো সময় কাটাচ্ছি, কিন্তু আমার মাথার ভেতরে তখনও প্রশ্ন ঘুরছে—সে কি সত্যিই আমার জন্য সঠিক মানুষ? এই ভাবনা খুবই ক্লান্তিকর।”
গ্রেসির মতে, রিলেশনশিপ ওসিডি ভালোবাসার অভাবের লক্ষণ নয়। বরং যেটি মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ওসিডি প্রায়ই সেটিকেই লক্ষ্যবস্তু বানায়।
বিশেষজ্ঞরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেও একটি প্রভাবক হিসেবে দেখছেন। কারণ অনলাইনে ‘নিখুঁত সম্পর্ক’-এর চিত্র অনেককে নিজেদের সম্পর্ক নিয়ে অযৌক্তিক তুলনা ও সন্দেহে ফেলতে পারে।
চিকিৎসকরা বলছেন, কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (সিবিটি), প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ এবং পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যসেবা রিলেশনশিপ ওসিডি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি সঙ্গীকে বারবার পরীক্ষা করা বা অতিরিক্ত আশ্বাস চাওয়ার প্রবণতা কমানো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, সম্পর্ক নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ও পুনরাবৃত্ত চিন্তা যদি দৈনন্দিন জীবন, কাজ বা মানসিক সুস্থতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
