সংসদমুখী ছাত্র মিছিলে পুলিশের লাঠিচার্জ, উত্তপ্ত নয়াদিল্লি
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকে আয়োজিত এই অভিযানে অংশ নিতে আসা হাজারো শিক্ষার্থীকে সংসদ ভবনের দিকে অগ্রসর হওয়া থেকে বিরত রাখতে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয় দিল্লি পুলিশ। এ সময় লাঠিচার্জ ও ধরপাকড়ের অভিযোগ ওঠে।
নয়াদিল্লিতে সোমবার ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যেও জাতীয় পতাকা হাতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ‘সংসদ চলো’ অভিযানে অংশ নেন। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আহ্বানে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের সংসদ ভবনের দিকে যেতে বাধা দিতে দিল্লি পুলিশ বিভিন্ন এলাকায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং আগেই অনুমতি প্রত্যাখ্যান করে।
তবে প্রশাসনিক বাধা উপেক্ষা করে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার শিক্ষার্থী সমাবেশে যোগ দেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বিপুল উপস্থিতি কেন্দ্রীয় সরকার ও দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষের প্রতিফলন।
এদিকে আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে বিষয়টি গুরুত্ব না দিলেও সোমবার কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও বিজেপির সাবেক সভাপতি জগৎ প্রকাশ নাড্ডা ছাত্রনেতাদের সঙ্গে আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করেন। সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে জানা যায়, তিনি আন্দোলনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের আহ্বান জানান। পরে সিজেপির নেতা ও মুখপাত্র সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাংকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ জানান, সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং তারা নাড্ডার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছেন।
নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস, সিবিএসই-সংক্রান্ত অনিয়ম এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে প্রায় এক মাস ধরে আন্দোলন চালিয়ে আসছে সিজেপি। এই আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন শিক্ষাবিদ ও পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক। তিনি দিল্লির যন্তর মন্তরে অনশন কর্মসূচিও পালন করছিলেন।
গত শনিবার পুলিশ অনশনরত ওয়াংচুককে হাসপাতালে ভর্তি করার পর যন্তর মন্তর খালি করার নির্দেশ দিলেও আন্দোলনকারীরা তা মানেননি। পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী রোববার রাত ও সোমবার ভোর থেকেই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী সেখানে জড়ো হন। পরে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ বাহিনী লাঠিচার্জ চালায় বলে অভিযোগ ওঠে।
সমাবেশে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের হাতে জাতীয় পতাকা, ভারতীয় সংবিধান এবং বাবাসাহেব আম্বেদকরসহ বিভিন্ন মনীষীর প্রতিকৃতি দেখা যায়। বৃষ্টির কারণে অনেকে রেইনকোট পরে কর্মসূচিতে অংশ নেন। হাসপাতাল থেকে ওয়াংচুক অনশন চালিয়ে গেলেও তিনি সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকসহ অন্যদের অনশন প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। পরে ছাত্রনেতারা অনশন ভেঙে মিছিলে যোগ দেন।
সংসদ ভবনের আশপাশের সব মেট্রোস্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়, যাতে শিক্ষার্থীরা সহজে সমাবেশস্থলে পৌঁছাতে না পারেন। এরপরও বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। পুলিশের হিসাবে, একপর্যায়ে সমাবেশে প্রায় ১২ হাজার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। তাদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে বিভিন্ন সড়কে ব্যারিকেড স্থাপন করা হয়। আন্দোলনকারীরা ব্যারিকেডের সামনে অবস্থান নিলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে।
সোমবারই ভারতের সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরু হয়েছে। সংসদ ভবনের নিরাপত্তা জোরদারে অতিরিক্ত ব্যারিকেড বসানো হয়। এমনকি কিছু স্থানে গার্ডরেলের উচ্চতা বাড়াতে ওয়েলডিংয়ের ব্যবস্থাও করা হয়।
তবে সিজেপি নেতারা আন্দোলনকারীদের বারবার শান্তিপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখার আহ্বান জানান। তাদের বক্তব্য, আন্দোলন সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক ও অহিংস এবং কোনো ধরনের সহিংসতা আন্দোলনের লক্ষ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
রোববারের ছাত্র সমাবেশে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা মহুয়া মৈত্র, আজাদ সমাজ পার্টির নেতা চন্দ্রশেখর আজাদ, আম আদমি পার্টির নেতৃবৃন্দ, অভিনেত্রী শাবানা আজমি ও অভিনেতা প্রকাশ রাজ উপস্থিত ছিলেন।
শাবানা আজমি বলেন, “আমরা শান্তিপূর্ণভাবে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শামিল হয়েছি। এই অধিকার দেশের সংবিধান দিয়েছে।” তিনি জানান, যোগেন্দ্র যাদবসহ নাগরিক সমাজের বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি যন্তর মন্তরে গিয়ে অনশনরত শিক্ষার্থীদের অনশন ভাঙাতে সহায়তা করেন।
এদিকে ছাত্র আন্দোলনের পাশাপাশি অযোধ্যার রামমন্দিরের কোষাগার লুট, আসন পুনর্বিন্যাস, নারী সংরক্ষণ, বিরোধী দল ভাঙার অভিযোগ, মূল্যস্ফীতি এবং বিভিন্ন বিতর্কিত আইনসহ নানা ইস্যুতে সংসদের চলতি অধিবেশন উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রথম দিনের অধিবেশনও এসব বিষয় নিয়ে বারবার মুলতবি হয়।
একই দিনে জম্মু ও কাশ্মীরকে পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে ন্যাশনাল কনফারেন্সসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। বিরোধী দলগুলোও এ দাবির প্রতি সমর্থন জানালেও অধিবেশন শুরুর আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বক্তব্যে বিষয়টির উল্লেখ ছিল না।
