ক্ষত নিরাময়ে জেলিফিশের অসাধারণ সক্ষমতা নিয়ে নতুন গবেষণা বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি স্বচ্ছ জেলিফিশ কয়েক মিনিটের মধ্যেই ক্ষত সারিয়ে ফেলতে পারে এবং তাতে কোনো দাগও থাকে না। গবেষকদের মতে, এই প্রক্রিয়া ভবিষ্যতে মানুষের ক্ষত দ্রুত ও দাগহীনভাবে নিরাময়ের নতুন চিকিৎসা প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সহায়ক হতে পারে।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষের শরীরে সামান্য কাটা বা ছড়ে যাওয়া ক্ষত সারতে সাধারণত কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগে এবং অনেক ক্ষেত্রে স্থায়ী দাগও থেকে যায়। কিন্তু ক্লাইটিয়া হেমিসফেরিকা নামের একটি ক্ষুদ্র স্বচ্ছ জেলিফিশের ক্ষেত্রে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের মেরিন বায়োলজিক্যাল ল্যাবরেটরির গবেষক জসলিন মালামি গত এক দশক ধরে এই জেলিফিশ নিয়ে গবেষণা করছেন। প্রাণীটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ হওয়ায় জীবন্ত অবস্থায়ই এর কোষীয় কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।
গবেষণায় দেখা গেছে, ছোট ধরনের ক্ষত কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেরে যায়। বড় ক্ষতও এক ঘণ্টার কম সময়ে বন্ধ হয়ে যায়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ক্ষত নিরাময়ের পর কোনো ধরনের দাগ তৈরি হয় না। গবেষকদের মতে, এ প্রক্রিয়া অনেকটা মানুষের ভ্রূণের প্রাথমিক পর্যায়ে ক্ষত নিরাময়ের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ক্ষত সৃষ্টি হওয়ার পর আশপাশের কোষগুলো আঙুলের মতো সূক্ষ্ম অংশ প্রসারিত করে ক্ষতস্থানের দিকে অগ্রসর হয় এবং ধীরে ধীরে জায়গাটি ঢেকে ফেলে। এরপর দড়ির মতো কাজ করা আরেক ধরনের কোষীয় গঠন সংকুচিত হয়ে ক্ষত পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। এই দুই ধাপের সমন্বিত কার্যক্রমের ফলেই জেলিফিশের ক্ষত অত্যন্ত দ্রুত নিরাময় হয়।
মানুষের শরীরে একই ধরনের প্রক্রিয়া কেন কার্যকরভাবে কাজ করে না—এ বিষয়ে ভারতের হেমচন্দ্রাচার্য নর্থ গুজরাট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হেরিস প্যাটেল বলেন, মানুষের শরীরে ক্ষত হলে প্রথমেই রক্তপাত নিয়ন্ত্রণ ও সংক্রমণ প্রতিরোধের কাজ শুরু হয়। এ সময় প্রদাহ সৃষ্টি হয় এবং কোলাজেন নামের একটি প্রোটিন জমা হয়ে শক্ত আবরণ তৈরি করে। এই কারণেই ক্ষত শুকিয়ে গেলেও অনেক ক্ষেত্রে দাগ থেকে যায়। জেলিফিশের শরীরে এমন দাগ তৈরির ব্যবস্থা নেই।
হেরিস প্যাটেলের মতে, মানুষের শরীরেও জেলিফিশের মতো কোষীয় মেরামত প্রক্রিয়া বিদ্যমান। তবে অতিরিক্ত প্রদাহের কারণে তা পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হতে পারে না। ফলে এই গবেষণা মানুষের ক্ষত নিরাময়ের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে নতুন ধারণা দিতে পারে।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এর অর্থ এই নয় যে অদূর ভবিষ্যতেই জেলিফিশ থেকে তৈরি ক্ষত নিরাময়ের ওষুধ বাজারে আসছে। বরং এ গবেষণার ফলাফল ভবিষ্যতে দাগ কমানোর চিকিৎসা, টিস্যু পুনর্গঠন এবং পুনর্জননভিত্তিক চিকিৎসা প্রযুক্তি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষকদের মতে, বিষয়টি বিবর্তন গবেষণার ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ। পৃথিবীর প্রাচীনতম প্রাণীগুলোর মধ্যে জেলিফিশ অন্যতম হওয়ায় এর শরীরে পাওয়া ক্ষত নিরাময়ের কৌশল মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীর মধ্যেও বহু আগে থেকেই কোনো না কোনো রূপে বিদ্যমান থাকতে পারে।
উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালে মহাকাশে জীবের বিকাশ নিয়ে গবেষণার অংশ হিসেবে নাসা দুই হাজারের বেশি শিশু জেলিফিশ মহাকাশে পাঠিয়েছিল। কয়েক দশক পর সেই প্রাণীই এবার দাগহীন ক্ষত নিরাময়ের সম্ভাব্য রহস্য উন্মোচনে বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
