ভারতের রাজধানী দিল্লিতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি বলপ্রয়োগের অভিযোগ নিয়ে জরুরি শুনানির আবেদন গ্রহণ করেননি ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। আদালতে ভিডিও প্রমাণ দেখানোর প্রস্তাবও তিনি নাকচ করে দেন।
বুধবার সুপ্রিম কোর্টে শিক্ষার্থীদের পক্ষে দায়ের করা এক আবেদনের শুনানিতে এই ঘটনা ঘটে। আবেদনকারীদের পক্ষের আইনজীবী আদালতকে জানান, দিল্লি পুলিশের কথিত নির্যাতনের ভিডিওচিত্র তাঁদের কাছে রয়েছে এবং তা আদালতকে দেখানোর সুযোগ দেওয়া হোক।
জবাবে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, “আমাদের সময় নষ্ট করবেন না এবং নিজের সময়ও নষ্ট করবেন না।” পরে তিনি আরও বলেন, “ভিডিও দেখার সময় আমাদের নেই।” ফলে আদালত এ বিষয়ে জরুরি শুনানির অনুমতি দেয়নি।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং জাতীয় পরীক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামে একটি তরুণ নেতৃত্বাধীন সংগঠন। শুরুতে অনলাইনভিত্তিক ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ হিসেবে গড়ে উঠলেও বর্তমানে এটি দেশের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। কংগ্রেসসহ বিভিন্ন বিরোধী দল প্রকাশ্যে এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
আদালতে শিক্ষার্থীদের পক্ষে আইনজীবী যুক্তি দেন, আন্দোলনকারীরা জাতীয় পর্যায়ের ‘নিট’ পরীক্ষার সুষ্ঠু পরিচালনা এবং ‘ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি’র সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরছেন। তবে তাঁর বক্তব্যের মাঝপথেই প্রধান বিচারপতি হস্তক্ষেপ করে বলেন, “আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।”
এরপর আইনজীবী আবারও পুলিশি বলপ্রয়োগের ভিডিওর প্রসঙ্গ তুললে প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, “আমরা ভিডিওতে আগ্রহী নই, এটি দেখার সময় আমাদের নেই।”
এর এক দিন আগে দিল্লি হাইকোর্টও একই ধরনের একটি আবেদনের জরুরি শুনানি গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেছিল, “আদালতকে এর মধ্যে টানবেন না।”
২০২৬ সালের মে মাসে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির আত্মপ্রকাশ ঘটে। এর আগে এক শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বেকার ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় তরুণদের ‘ককরোচ’ (তেলাপোকা) ও ‘পরজীবী’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। সেই মন্তব্যকে কেন্দ্র করেই সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপ ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সংগঠনটির ঘোষণা দেন।
অল্প সময়ের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠনটির জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ে এবং একটি প্ল্যাটফর্মে তাদের অনুসারীর সংখ্যা বিজেপির অনুসারীদেরও ছাড়িয়ে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিভিন্ন ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে দিল্লি পুলিশ বারবার কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ, লাঠিচার্জ এবং প্লাস্টিকের ব্যাটন ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সংসদ অভিমুখে সিজেপির ডাকা পদযাত্রায় হাজার হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেন। আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপ দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গত সোমবার সংসদের নতুন অধিবেশন শুরুর আগে কিছু ব্যারিকেড ভেঙে ফেলার ঘটনায় বিক্ষোভকারীদের ওপর লাঠিচার্জ করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া করে মারধরের দৃশ্য দেখা গেছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, গত এক দশকে দিল্লিতে এটি সবচেয়ে বড় ছাত্র আন্দোলনগুলোর একটি, যা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
যদিও সাম্প্রতিক আঞ্চলিক নির্বাচনে বিজেপি নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে, তবু চলমান আন্দোলন থামার পরিবর্তে সংসদ অধিবেশন শুরুর পর আরও বিস্তৃত হয়েছে।
আন্দোলন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা ব্যাখ্যা থাকলেও শিক্ষার্থীদের দাবি ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
