যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাত থামাতে কাতার, মিসর, পাকিস্তানসহ একাধিক মধ্যস্থতাকারী দেশ যুদ্ধবিরতির নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। ১০ দিনের জন্য সামরিক অভিযান স্থগিত, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক নৌ চলাচল পুনরায় চালু এবং আগের অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্মারক কার্যকর করার প্রস্তাব দেওয়া হলেও উভয় দেশের সামরিক অবস্থান আরও কঠোর হওয়ায় কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সাফল্য নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত অবনতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরা। তাঁদের লক্ষ্য, পাল্টাপাল্টি হামলার চক্র থামিয়ে সংঘাতকে বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেওয়া থেকে বিরত রাখা।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই গত সোমবার জানান, সংঘাত যাতে আর না বাড়ে, সে লক্ষ্যে বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। তবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করেননি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, কাতার, মিসর ও পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কাছে একটি নতুন প্রস্তাব দিয়েছে। এতে ১০ দিনের জন্য সব ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধ রাখা, গত মাসে হওয়া অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্মারক পুনরায় কার্যকর করা এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক নৌ চলাচল স্বাভাবিক করার সুপারিশ করা হয়েছে।
কূটনৈতিক উদ্যোগ চললেও বাস্তবে উভয় পক্ষের সামরিক তৎপরতা বেড়েই চলেছে। সাম্প্রতিক হামলাগুলো শুধু সামরিক স্থাপনায় সীমাবদ্ধ না থেকে বেসামরিক অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করছে।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আরও অভ্যন্তরীণ এলাকায় বিমান হামলা জোরদার করেছে। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার ঘটনার জন্য ইরানকে “এর মূল্য দিতে হবে”।
অন্যদিকে ইরানও আঞ্চলিক বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তু এবং সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলের ওপর হামলা বাড়িয়েছে।
বর্তমান সংঘাতের সূচনা হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন ইরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালায়। এরপর উভয় দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে আসছে।
সর্বশেষ প্রস্তাবটি ১১ জুলাই ওমানের রাজধানী মাসকাটে ওমান, ইরান ও কাতারের আলোচনার ভিত্তিতে তৈরি করা হয়, যদিও সে আলোচনা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি।
প্রস্তাব অনুযায়ী—
- ১০ দিনের জন্য সব ধরনের সামরিক অভিযান স্থগিত রাখা হবে।
- হরমুজ প্রণালির উভয় নৌপথ পুনরায় খুলে দেওয়া হবে।
- আগের সমঝোতা স্মারক পুনরায় কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
- ভবিষ্যতে ট্রানজিট ফি বা নৌ চলাচলের মাশুল ব্যবস্থাপনা নিয়েও আলোচনা হবে।
বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ হরমুজ প্রণালি দিয়ে হওয়ায় এ জলপথের নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাজ্যের ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সাইমন ম্যাবন বলেন, আগের সমঝোতা স্মারকটি শুরুতে সংঘাত কমাতে কার্যকর হলেও সেটি ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট রাখা হয়েছিল। ফলে উভয় পক্ষ নিজেদের সুবিধামতো এর ব্যাখ্যা দিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে।
তিনি বলেন, “তাই নতুন যেকোনো চুক্তিতে সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে, যাতে একই ধরনের বিরোধের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।”
ম্যাবনের মতে, বর্তমানে ইরান হরমুজ প্রণালিকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করছে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার ঘটনায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর পাল্টা জবাব দেওয়ার রাজনৈতিক চাপও বেড়েছে। এতে উভয় দেশই “উত্তেজনার ফাঁদে” আটকে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান হরাইজন এনগেজ-এর পরিচালক অ্যালেক্স আলমেদা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ইরানের আরও অভ্যন্তরে বিস্তৃত হলেও এর মূল কেন্দ্র এখনো হরমুজ প্রণালি। তাঁর মতে, এটি ইঙ্গিত দেয় যে ওয়াশিংটন সংঘাতকে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখতে চাইছে।
তিনি বলেন, “নতুন কোনো আলোচনা শুরু হওয়ার আগে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি এলাকায় অন্তত আরও এক সপ্তাহ পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকতে পারে।”
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফট-এর নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি মনে করেন, সামরিক অভিযান চলমান থাকলে ইরানের আলোচনায় ফেরার সম্ভাবনা খুবই কম।
তাঁর ভাষায়, “যতক্ষণ না কূটনীতির প্রতি পূর্ণ প্রতিশ্রুতি তৈরি হচ্ছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে সামরিক অভিযান পুরোপুরি বন্ধ করা হচ্ছে, ততক্ষণ কূটনীতি সফল হবে না।”
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত এখন বেসামরিক অবকাঠামো, জ্বালানি স্থাপনা এবং সমুদ্রপথ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। ইরানের দাবি, সাম্প্রতিক মার্কিন হামলায় রেলস্টেশন, আবাসিক এলাকা, সেতু, পানি শোধনাগার ও খাদ্যগুদাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের পাল্টা হামলায় কুয়েতের একটি লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পাশাপাশি বাহরাইন ও জর্ডানের বিভিন্ন স্থাপনাও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের সামুদ্রিক অবরোধ এবং লোহিত সাগরের কৌশলগত বাব আল-মানদেব প্রণালিতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
অধ্যাপক সাইমন ম্যাবন বলেন, “সবচেয়ে বড় বিপদ হতে পারে এ সংঘাত যদি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশদ্বার ‘বাব আল-মানদেব’সহ অন্যান্য কৌশলগত নৌপথে ছড়িয়ে পড়ে। নৌপথটি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলে তা হরমুজ প্রণালির ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলবে, যা বিশ্ববাজারে তেলের দাম এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনকে আরও বিপর্যস্ত করবে।”
বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিটি নতুন দফার সামরিক হামলার ফলে সংঘাত নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিও সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির পথে একটি বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে।
অধ্যাপক ম্যাবনের মূল্যায়ন, মধ্যস্থতাকারীরা যতই চেষ্টা করুন না কেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষ বড় ধরনের নীতিগত ছাড় না দিলে বর্তমান কূটনৈতিক উদ্যোগ সফল হওয়ার সম্ভাবনা সীমিত।
