কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে হাওরের পানিতে ডুবে যাওয়া আট বছরের মেয়েকে উদ্ধার করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন এক বাবা। শুক্রবারের ওই মর্মান্তিক ঘটনার পাশাপাশি জেলার নিকলী, মিঠামইন, কটিয়াদী ও ভৈরবে পৃথক ঘটনায় পানিতে ডুবে আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এক দিনে জেলায় মোট পাঁচজনের মৃত্যুর ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার বালিখলা হাওরসংলগ্ন হাসানপুর সেতু এলাকায় শুক্রবার বিকেলে পরিবার নিয়ে বেড়াতে গিয়েছিলেন মো. বাছির উদ্দিন। স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে পরিবারের সদস্যরা একটি ডুবুডুবু সড়কের পাশে নৌকা থেকে নেমে গোসল করছিলেন। এ সময় তাঁর আট বছর বয়সী মেয়ে শেমন্ত্রী আক্তার হঠাৎ গভীর পানিতে পড়ে গেলে কোনো বিলম্ব না করে পানিতে ঝাঁপ দেন বাছির উদ্দিন।
প্রাণপণ চেষ্টায় তিনি মেয়েকে নিরাপদে অন্যদের হাতে তুলে দিতে সক্ষম হলেও তীব্র স্রোতের কারণে নিজে আর তীরে ফিরতে পারেননি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি পানিতে তলিয়ে যান। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
নিহত বাছির উদ্দিন কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার গাইটাল পেট্রোলপাম্প এলাকার বাসিন্দা আবু বাক্কার মাস্টারের ছেলে। তিনি পেশায় একজন ফিজিওথেরাপিস্ট ছিলেন।
করিমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোহেব খান বলেন, “মেয়েকে উদ্ধার করতে গিয়ে বাছির উদ্দিন পানিতে তলিয়ে মারা গেছেন। পরে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।”
একই দিনে জেলার আরও চারটি পৃথক ঘটনায় চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
নিহত শিশুরা হলো—নিকলী উপজেলার কারপাশা ইউনিয়নের নানশ্রী গ্রামের নজরুল ইসলামের ছেলে মোহাম্মদ হাকিম (৫), গাজীপুরের টঙ্গী এরশাদ নগরের বাসিন্দা আলমগীর হোসেনের ছেলে ও মাদ্রাসাছাত্র আরিফ হোসেন (১২), কটিয়াদী উপজেলার দক্ষিণ লোহাজুরি গ্রামের মজনু মিয়ার ছেলে নাঈম মিয়া (১১) এবং ভৈরব উপজেলার জগন্নাথপুর মধ্যপাড়া এলাকার মো. সোহেল মিয়ার ছেলে শুভ ইসলাম (১২)।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, শুক্রবার সকালে বাড়ির পাশে খেলতে গিয়ে অসাবধানতাবশত পুকুরে পড়ে যায় হাকিম। পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে নিকলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নিকলী থানার ওসি মো. মাহবুবুর রহমান।
অন্যদিকে, মিঠামইন হাওর ভ্রমণে গিয়ে গোসলের সময় তীব্র স্রোতে ভেসে যায় মাদ্রাসাছাত্র আরিফ হোসেন। গাজীপুরের টঙ্গী এলাকার একটি কওমি মাদ্রাসার প্রায় ৪০ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন এক শিক্ষক। দুপুরে ঘটনাস্থলের কাছ থেকে আরিফের মরদেহ উদ্ধার করা হয় বলে জানান মিঠামইন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) তাইজুল ইসলাম।
কটিয়াদীতে সহপাঠীদের সঙ্গে বিলে গোসল করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয় নাঈম মিয়া। গোসল শেষে বাড়ি ফেরার পথে বিলে ফেলে আসা একটি প্লাস্টিকের বোতল আনতে একা ফিরে গেলে পা পিছলে গভীর পানিতে পড়ে যায় সে। স্থানীয়রা উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন কটিয়াদী মডেল থানার ওসি মো. রফিকুল ইসলাম।
এদিকে, ভৈরব উপজেলার শুভ ইসলাম বৃহস্পতিবার গোসল করতে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে শুক্রবার সকালে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। পরে বিকেলে জগন্নাথপুর এলাকার নদীতে তার মরদেহ ভেসে উঠলে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে।
ভৈরব থানার তদন্ত কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত ওসি) লিমন বোস জানান, এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
