দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়তে থাকায় সাধারণ জ্বর ও ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণের পার্থক্য বুঝে ওষুধ সেবনের আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা। তাঁদের মতে, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বা অ্যাসপিরিনজাতীয় ওষুধ গ্রহণ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। জ্বর হলে আপাতত প্যারাসিটামল সেবন এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দেশজুড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে জ্বরের রোগীদের ওষুধ ব্যবহারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন মেডিসিন ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের ভাষ্য, সাধারণ জ্বরের ক্ষেত্রে অযথা অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের প্রয়োজন নেই। বরং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল গ্রহণ করাই নিরাপদ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বরের পাশাপাশি তীব্র মাথাব্যথা, সারা শরীর ও গিঁটে ব্যথা এবং ত্বকে র্যাশ দেখা দিলে সেটি ডেঙ্গুর লক্ষণ হতে পারে। এ ধরনের উপসর্গ থাকলে অ্যাসপিরিনজাতীয় ওষুধ এড়িয়ে চলা উচিত এবং দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের মোট ৫৯টি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুর উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চলতি বছরের ২৩ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে আক্রান্ত হয়েছেন ১২ হাজার ২০ জন এবং ১০ হাজার ৯১১ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের মূল উপায় হলো জনসচেতনতা বৃদ্ধি, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং মশার কামড় থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা। একই সঙ্গে উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হাসান হাফিজুর রহমান বলেন,
“জ্বর হলে শুধু প্যারাসিটামল ওষুধ সেবন করতে হবে। জ্বরের সঙ্গে মাথা ব্যথা, সমস্ত শরীর ব্যথা, গিরায় গিরায় ব্যথা, গায়ে রেশ দেখা দিলে ডেঙ্গু জ্বর হওয়ার লক্ষণ। এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলেও অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকতে হবে।”
তিনি আরও বলেন,
“চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসাব্যবস্থা নেওয়া নিরাপদ। নিজেরা ওষুধের দোকান থেকে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ব্যতীত কোনো ওষুধ ক্রয় করে খাবেন না।”
শিশুদের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত তরল খাবার, যেমন ডাবের পানি ও শরবত পান করানোর পাশাপাশি বাইরে গেলে ফুলহাতা জামা, ফুলপ্যান্ট ও মোজা পরানোরও পরামর্শ দেন তিনি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, বর্তমানে করোনা, ডেঙ্গু ও ডায়রিয়াসহ একাধিক ভাইরাসজনিত রোগ একসঙ্গে ছড়িয়ে পড়ায় অনেকেই বিভ্রান্ত হচ্ছেন। তবে আতঙ্কিত না হয়ে লক্ষণ অনুযায়ী পরীক্ষা করানো এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, প্রতিবছর ডেঙ্গু মোকাবিলায় সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। তাঁর মতে, শুধু কীটনাশক ছিটিয়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; এ বিষয়ে সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিশিষ্ট শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ও বিসিএস হেলথ ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এডিস মশা সাধারণত পরিষ্কার ও অল্প গভীর পানিতে ডিম পাড়ে। তাই ফুলের টব, ছাদ, বারান্দা, পুরোনো টায়ার বা ছোট পাত্রে জমে থাকা পরিষ্কার পানি নিয়মিত অপসারণ করা জরুরি।
তিনি আরও জানান, সূর্যোদয়ের পর প্রথম দুই ঘণ্টা এবং সূর্যাস্তের আগের দুই থেকে তিন ঘণ্টা এডিস মশা সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে। এ সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী বলেন, বর্তমানে ডেনভ-৩ (DENV-3) সেরোটাইপ সংক্রমণের কারণে রোগীদের মধ্যে দ্রুত ডেঙ্গু শক সিনড্রোম-এর মতো জটিলতা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। তাই জ্বরকে অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়ার পাশাপাশি বাসাবাড়ির আশপাশে কোথাও যেন পানি জমে না থাকে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।
