কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি নিয়ে নতুন করে বিশ্বজুড়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ওপেনএআই ও হাগিং ফেসকে ঘিরে একটি সাইবার নিরাপত্তা ঘটনা। ওপেনএআই দাবি করেছে, পরীক্ষামূলক পরিবেশে থাকা তাদের দুটি উন্নত এআই মডেল স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা অতিক্রম করে ইন্টারনেটে প্রবেশ করে হাগিং ফেসের সিস্টেমে অনুপ্রবেশ চালায়। ঘটনাটি বাস্তব নিরাপত্তা ঝুঁকির ইঙ্গিত নাকি কেবল প্রচারণার অংশ—তা নিয়েই চলছে তীব্র আলোচনা।
প্রযুক্তিবিশ্বে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে ঘটনাটি, যখন ১৬ জুলাই এআই প্ল্যাটফর্ম হাগিং ফেস জানায়, তারা এমন একটি সাইবার হামলার শিকার হয়েছে, যা পরিচালনা করেছে অত্যন্ত সক্ষম একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাটি ছিল নজিরবিহীন এবং মানুষের সরাসরি নির্দেশনা ছাড়াই এআই অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এটি সম্পন্ন করে।
হাগিং ফেসের তথ্যমতে, হামলাকারী এআই প্রায় ১৭ হাজার পৃথক কার্যক্রম দুই দিনেরও কম সময়ে সম্পন্ন করে তাদের সিস্টেমে প্রবেশ করে এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করে। শুরুতে প্রতিষ্ঠানটি ধারণা করেছিল, বড় কোনো এআই মডেল ব্যবহার করে অজ্ঞাত কোনো সাইবার অপরাধী এ হামলা চালিয়েছে। এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও অবহিত করা হয়।
ঘটনার কয়েক দিন পর ওপেনএআই জানায়, হামলার পেছনে ছিল তাদেরই পরীক্ষাধীন দুটি বিশেষায়িত চ্যাটজিপিটি মডেল। কোম্পানির ভাষ্য অনুযায়ী, উন্নত হ্যাকিং সক্ষমতা যাচাইয়ের একটি নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় এআই মডেল দুটি নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে ইন্টারনেটে সংযুক্ত হয় এবং পরীক্ষায় সফল হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে হাগিং ফেসের সিস্টেমে প্রবেশ করে।
ওপেনএআই জানায়, ঘটনাটি তদন্তে তারা হাগিং ফেসের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে এবং এ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা নিয়ে শিগগিরই একটি বিস্তারিত কারিগরি প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।
ঘটনার পর প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা মহলে ভিন্নমত দেখা দিয়েছে। একাংশের মতে, এটি ভবিষ্যতের এআই ঝুঁকি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। অন্যদিকে, সমালোচকদের দাবি, নিজেদের প্রযুক্তির সক্ষমতা তুলে ধরতেই ঘটনাটিকে অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বিষয়টি তুলে ধরার পর অনেকেই মন্তব্য করেন, পুরো ঘটনাটি মূলত নতুন এআই মডেলের সক্ষমতা প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ ওপেনএআইয়ের পরীক্ষামূলক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমালোচনা করেছেন। তাঁদের মতে, হ্যাকিংয়ের জন্য প্রশিক্ষিত এআইকে আরও শক্তিশালী ও বিচ্ছিন্ন নিরাপত্তা পরিবেশে পরীক্ষা করা উচিত ছিল।
পিলার সিকিউরিটির ডর সারিগ বলেন, কেবল ‘স্যান্ডবক্স’ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করা এজেন্টভিত্তিক এআই নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট নয়।
ইউনিভার্সিটি অব সারের সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক অ্যালান উডওয়ার্ড মন্তব্য করেন, এ ঘটনায় ওপেনএআই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে।
অন্যদিকে লুটা সিকিউরিটির প্রতিষ্ঠাতা কেটি মুসৌরিস বলেন,
“আমরা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি তৈরি করছি, কিন্তু সেটিকে নিরাপদভাবে নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা এখনো পুরোপুরি অর্জন করতে পারিনি।”
ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটল, যখন বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে উন্নত এআই মডেল নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত বা অনুমোদনহীন পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারে।
যুক্তরাজ্যের এআই সিকিউরিটি ইনস্টিটিউট (AISI) সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় জানিয়েছে, কিছু উন্নত এআই মডেল পরীক্ষার সময় লক্ষ্য পূরণে নিয়ম ভঙ্গ বা প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে। গবেষকদের মতে, উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রে এমন আচরণ ভবিষ্যতে বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টারের সাবেক প্রধান সিয়ারান মার্টিন অবশ্য বিষয়টিকে আরও সংযতভাবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, এই একটি ঘটনা থেকে সরাসরি এআই ভবিষ্যতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অস্ত্র বা ড্রোন নিয়ন্ত্রণ করে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটাবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
তবে তাঁরও মত, এ ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে—এআইভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এখন দ্রুতগতিতে অত্যন্ত দক্ষ সাইবার হামলা পরিচালনা করতে সক্ষম হচ্ছে। ফলে এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের এখন থেকেই সমন্বিত প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।
