তীব্র তাপপ্রবাহ শুধু শারীরিক স্বাস্থ্য নয়, মানুষের মানসিক সুস্থতার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে নারী ও তরুণদের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত উদ্বেগ বা ‘ক্লাইমেট অ্যাংজাইটি’ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এই উদ্বেগ মোকাবিলায় পারস্পরিক আলোচনা, সামাজিক উদ্যোগে অংশগ্রহণ এবং নিজের শারীরিক সুস্থতার যত্ন নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে নতুন ধরনের চাপ তৈরি করছে। যুক্তরাজ্যের চেলটেনহ্যামের বাসিন্দা দুই সন্তানের মা ৩৬ বছর বয়সী টাভিয়া ওয়াটস বিবিসিকে বলেন, জুন মাসের তীব্র তাপপ্রবাহে তার ছোট দুই সন্তানের শোবার ঘরের তাপমাত্রা অনেক সময় ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি ছিল। সেই পরিস্থিতিতে তিনি সারাক্ষণ উদ্বিগ্ন ছিলেন।
টাভিয়ার ভাষায়, “তাপপ্রবাহের সময় আমি সব সময়ই তীব্র উদ্বেগে ভুগি। সন্তানদের ঘর এত গরম হয়ে যায় যে, তাদের জন্য ভয় লাগে। অনেক সময় কান্না থামাতে আমাকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে হয়েছে।”
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি বলেন, “মনে হয় যেন পৃথিবীর শেষ সময় চলে এসেছে। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি ভীষণ আতঙ্কিত। যারা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না, তাদের দেখে চিৎকার করতে ইচ্ছা করে।” ভিডিওটি ১৮ হাজারের বেশি লাইক এবং প্রায় ১ হাজার ৭০০ বার পুনঃশেয়ার হয়।
২০২২ সালে ইউনিভার্সিটি অব বাথের এক গবেষণায় দেখা যায়, যুক্তরাজ্যের প্রায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ জলবায়ুজনিত উদ্বেগে ভুগছেন। ২০২৫ সালের আরেকটি গবেষণা অনুযায়ী, নারী ও তরুণদের মধ্যে এ ধরনের মানসিক চাপের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
ইউনিভার্সিটি অব বাথের মনোবিজ্ঞানী ডা. ক্যারোলিন হিকম্যান এবং ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ডের গবেষক ডা. এমা লরেন্স বলেন, তাপপ্রবাহের মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনা ঘন ঘন ঘটায় মানুষের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে আগাম উদ্বেগ বা ‘অ্যান্টিসিপেটরি অ্যাংজাইটি’ বেড়ে যাচ্ছে।
ডা. হিকম্যানের ভাষায়, “একবার কেউ বন্যা বা তাপপ্রবাহের মতো অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গেলে পরবর্তী একই ধরনের ঘটনার আশঙ্কা তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। এতে মানুষের মনে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়।”
তিনি জানান, সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহের সময় এমন রোগীর মুখোমুখি হয়েছেন, যারা আত্মহত্যার চিন্তা, গর্ভধারণ বন্ধ করা কিংবা অপেক্ষাকৃত শীতল অঞ্চলে চলে যাওয়ার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন।
টাভিয়া ওয়াটস বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে শুধু হতাশায় ডুবে না থেকে তিনি ইতিবাচক উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাপপ্রবাহের সময় তিনি বিভিন্ন গণস্বাক্ষর অভিযানে অংশ নেন, জলবায়ুবিষয়ক কমিউনিটি কার্যক্রম পরিচালনা করেন এবং শিশুদের জন্য বিনামূল্যে পোশাক বিনিময় কার্যক্রম চালান। সর্বশেষ তাপপ্রবাহের সময় তিনি নিরামিষভোজীও হয়েছেন।
তার ভাষায়, “হয় আপনি সবকিছু নিয়ে হতাশ হয়ে পড়বেন, নয়তো কিছু করার চেষ্টা করবেন। অন্তত আমার সন্তানদের বলতে পারব, আমি চেষ্টা করেছি।”
পশ্চিম লন্ডনের ৩৮ বছর বয়সী লিজি এলেন জানান, সম্প্রতি সন্তানের জন্মের পর তিনি প্রায়ই আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখেন এবং তাপপ্রবাহ নিয়ে নিয়মিত খবর পড়েন।
তিনি বলেন, “শিশুকে ঠান্ডা রাখার চিন্তায় আমাকে অনেক বেশি সময় ঘরে থাকতে হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই তাপমাত্রাই যদি স্বাভাবিক হয়ে যায়, তাহলে আমার সন্তানের জীবন কেমন হবে—সেই ভাবনা আমাকে আতঙ্কিত করে।”
অন্যদিকে পরিবেশবিদ ডা. ফ্রান্সিস উইন্ডরাম অপেক্ষাকৃত শীতল আবহাওয়ার কারণে লন্ডনের কাছের অ্যাসকট ছেড়ে ইংল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ল্যাঙ্কাস্টারে বসবাস শুরু করেছেন। তবে তিনি এখনও দক্ষিণাঞ্চলে থাকা তার বাবা ও দাদা-দাদির স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডা. এমা লরেন্স জলবায়ুজনিত উদ্বেগ কমাতে কয়েকটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন—
- নিজের উদ্বেগ ও অনুভূতি অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করা।
- একই ধরনের সচেতন মানুষের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ ও কমিউনিটি গড়ে তোলা।
- গাছ লাগানো, পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ কিংবা নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের মতো ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া।
- তীব্র গরমে শরীর ঠান্ডা রাখা, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং প্রয়োজনে ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করা।
তার ভাষায়, “নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হোন। মনে রাখুন, উদ্বেগের উৎস হচ্ছে পৃথিবীর প্রতি আপনার যত্ন। আমরা অসহায় নই—পরিস্থিতি মোকাবিলায় অনেক কিছুই করার সুযোগ রয়েছে।”
