অন্তঃসত্ত্বা মা হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত হলে নবজাতকের সংক্রমণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। তবে গর্ভাবস্থায় প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, সময়মতো চিকিৎসা এবং জন্মের পর দ্রুত টিকা ও ইমিউনোগ্লোবুলিন প্রয়োগের মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিশুকে এই সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উপলক্ষে শিশু বিশেষজ্ঞ ও বারডেম হাসপাতালের অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, হেপাটাইটিস বি–পজিটিভ অন্তঃসত্ত্বা মায়ের গর্ভস্থ শিশু, বিশেষ করে জন্মের সময় নবজাতকের এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। সংক্রমিত শিশুর দীর্ঘমেয়াদে লিভারের জটিল রোগ, এমনকি লিভার সিরোসিসের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তবে সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এই ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হেপাটাইটিস বি–পজিটিভ অন্তঃসত্ত্বা মায়ের ক্ষেত্রে আগে থেকেই এইচবিভি ডিএনএ (HBV DNA) এবং এইচবিইএজি (HBeAg) পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরে ভাইরাসের মাত্রা বা তীব্রতা নির্ণয় করা যায়।
পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী ভাইরাল লোড বেশি থাকলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে গর্ভাবস্থার ২৮ থেকে ৩২ সপ্তাহের মধ্যে হেপাটাইটিস বি–এর চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ শুরু করা হয়। এতে মায়ের শরীরে ভাইরাসের পরিমাণ কমে এবং নবজাতকের সংক্রমণের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, শিশুর জন্মের ১২ ঘণ্টার মধ্যে যত দ্রুত সম্ভব হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ (জন্ম ডোজ) এবং হেপাটাইটিস বি ইমিউনোগ্লোবুলিন (HBIG) আলাদা দুই ঊরুতে প্রয়োগ করতে হবে। এই দুটি একসঙ্গে প্রয়োগ করলে নবজাতকের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত হয়।
জন্মের সময় এই ডোজ দেওয়া হলেও জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি অনুযায়ী দেড়, আড়াই ও সাড়ে তিন মাস বয়সে পেনটা টিকার সঙ্গে হেপাটাইটিস বি–এর বাকি ডোজগুলো অবশ্যই সম্পন্ন করতে হবে।
সব টিকা সম্পন্ন হওয়ার পর শিশুর শরীরে হেপাটাইটিস বি–এর বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে ৯ থেকে ১২ মাস বয়সে, অথবা পেনটা টিকার শেষ ডোজ নেওয়ার অন্তত ১–২ মাস পরে, এইচবিএসএজি (HBsAg) ও এন্টি–এইচবিএস (Anti-HBs) পরীক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
মায়ের হেপাটাইটিস বি শনাক্ত হলে শিশুর বাবাসহ পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যদেরও এইচবিএসএজি পরীক্ষা করানো উচিত। যাঁদের শরীরে সংক্রমণ নেই এবং আগে টিকা নেওয়া হয়নি, তাঁদের পূর্ণ ডোজে হেপাটাইটিস বি টিকা গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
হেপাটাইটিস বি–পজিটিভ মায়ের ক্ষেত্রে নবজাতককে বুকের দুধ খাওয়ানো নিয়ে অনেকের মধ্যে দ্বিধা থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্মের সময় শিশুকে HBIG ও হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিন দেওয়া থাকলে মায়ের বুকের দুধ পান করানো নিরাপদ। তবে মায়ের স্তনের বোঁটা ফেটে রক্তপাত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, গর্ভাবস্থায় সব মায়ের এইচবিএসএজি পরীক্ষা করা উচিত। ফলাফল পজিটিভ হলে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত পরীক্ষা করে ভাইরাসের মাত্রা নির্ণয় করতে হবে এবং প্রয়োজন হলে গর্ভাবস্থাতেই চিকিৎসা শুরু করতে হবে।
তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, শিশুর জন্মের ১২ ঘণ্টার মধ্যে HBIG ও হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিন প্রয়োগ, নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী সব টিকার ডোজ সম্পন্ন করা এবং পরে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করে সুরক্ষা নিশ্চিত করা—এই তিনটি ধাপই নবজাতককে হেপাটাইটিস বি সংক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
