২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে সামরিক হেলিকপ্টারে ভারতে চলে যান। এর মধ্য দিয়ে টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে এবং দিনটি ছাত্র-জনতার বিজয়ের প্রতীক হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেয়।
সেদিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘোষিত এক দফা দাবির অংশ হিসেবে দেশজুড়ে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি পালিত হয়। একই সঙ্গে সরকার পতন ও ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অবসানের দাবিতে চলমান অসহযোগ আন্দোলনের দ্বিতীয় দিন ছিল এটি। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লাখো মানুষ গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জাতীয় সংসদ ভবনের দিকে অগ্রসর হন।
সকালের দিকে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, পুরান ঢাকা, শাহবাগসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আন্দোলনকারীরা রাজধানীর কেন্দ্রস্থলের দিকে অগ্রসর হলে বিভিন্ন স্থানে তাঁদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সেনাবাহিনী সতর্ক অবস্থানে থাকলেও দুপুরের আগেই সরকারের পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে।
একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জাতীয় সংসদ ভবনে প্রবেশ করেন। এসব স্থানে বিজয়ের উল্লাসে মেতে ওঠেন হাজারো মানুষ। অনেকের হাতে ছিল জাতীয় পতাকা। কেউ কেউ সরকারি ভবন থেকে বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে বেরিয়ে যান। বিভিন্ন দেয়াল ও স্থাপনায় স্লোগান, প্রতিবাদী লেখা ও চিত্রাঙ্কনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার শাসনামলের নানা অভিযোগ ও ক্ষোভও প্রকাশ করা হয়।
জনতা গণভবনে পৌঁছানোর আগেই বেলা আড়াইটার দিকে শেখ হাসিনা ছোট বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে সামরিক হেলিকপ্টারে ভারতে চলে যান। এর কয়েক দিন আগেই, ১ আগস্ট, তিনি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, “শেখ হাসিনা কখনো পালায় না।”
তবে সরকার পতনের দিনও সহিংসতা থামেনি। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গুলির ঘটনা ঘটে এবং আন্দোলনকারীদের প্রাণহানির খবর আসে। শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পরও বিচ্ছিন্নভাবে গুলি চলার ঘটনা ঘটে। ওই দিন সারা দেশে শতাধিক মানুষ নিহত হন। এর আগের দিনও নিহতের সংখ্যা শতাধিক ছিল।
সরকারি গেজেট অনুযায়ী, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদের সংখ্যা ৮৪৩। অন্যদিকে জাতিসংঘের হিসেবে এই সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৪০০ হতে পারে। প্রাণহানার দিক থেকে এই অভ্যুত্থান ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের তুলনায় অনেক বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা সামনের সারিতে থাকলেও নারীদের অংশগ্রহণও ছিল উল্লেখযোগ্য। ছাত্রী, নারী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
সরকার পতনের পর রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনাও ঘটে। প্রধান বিচারপতির বাসভবন, শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত বাসভবন সুধা সদন, ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পাশাপাশি ক্ষমতাচ্যুত মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের নেতাদের বাড়ি এবং দলীয় কার্যালয়েও হামলার খবর পাওয়া যায়।
শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর সেনা সদর দপ্তরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। বৈঠকে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিস, গণসংহতি আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বৈঠক শেষে সেনাপ্রধান সাংবাদিকদের জানান, সব প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি সব হত্যাকাণ্ড ও অন্যায়ের বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন এবং জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান। পাশাপাশি অচিরেই ছাত্র-শিক্ষক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের কথাও জানান।
একই দিন বিকেলে বঙ্গভবনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সভাপতিত্বে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আন্দোলনে নিহতদের স্মরণে শোকপ্রস্তাব গ্রহণ করা হয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ধৈর্য ও সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার বিষয়েও সবাই একমত হন।
বৈঠকে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও অন্যান্য মামলায় আটক ব্যক্তিদের মুক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
৫ আগস্ট রাতে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ, আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া ও আবু বাকের মজুমদার।
সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম বলেন, ছাত্র-নাগরিকদের সমর্থিত বা প্রস্তাবিত সরকার ছাড়া অন্য কোনো সরকারকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সমর্থন করবে না। একই সঙ্গে তিনি জানান, সেনাসমর্থিত সরকার বা জরুরি অবস্থা জারির মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার গঠনের কোনো উদ্যোগ আন্দোলনকারীরা গ্রহণ করবে না।
